।। সাতরঙা পাড় ।। কল্পোত্তম ।।
শ্রীদাম কুমার
'কুবোপাখি প্রকাশনা' প্রকাশিত কল্পোত্তমের কাব্যগ্রন্থ 'সাতরঙা পাড়'। কবির কবিতার সঙ্গে রেখাচিত্রেরও যুগলবন্দি এটি।
পাতা, মুদ্রণ, বোর্ডবাঁধাই আর চিত্রশিল্পী পার্থপ্রতিম দাসের প্রচ্ছদ- অসাধারণ।
এই প্রকাশনা থেকে এমন নন্দিত ও সুচারু সম্পাদনায় এরকম একটি বই বের করতে পারাটা যেকোনো নবীন কবির পক্ষেই সযত্ন-লালিত এক স্বপ্ন।
কল্পোত্তমের 'সাতরঙা পাড়' কাব্যগ্রন্থটি প্রথম ঝলকেই কেড়ে নেয় আমাদের বিমুগ্ধ দৃষ্টি। জগৎ ও জীবনের গতিপ্রবাহের বাঁকে বাঁকে পাওয়া কিছু গহন উপলব্ধি ও অনুভূতিকে ঘিরেই নির্মিত কাব্যের অন্তর্বর্ণন।
মোট একুশটি কবিতায় দর্শন, বিজ্ঞান, পুরাণ, বহু বিচিত্র বিষয়ের অনুষঙ্গ-চিহ্নায়নের বিচ্ছুরিত সাতরঙা আলো বর্ণময় করে তুলেছে কাব্যগ্রন্থটিকে। যেন কাব্যের শরীরী-মায়ায় জড়িয়ে থাকা সাতরঙা পাড়।
গ্রন্থটির প্রথম কবিতা 'প্ৰবাহী'--- শরীরী-চেতনার কবিতা হতে গিয়েও শেষে কবিতাটির সুরটি বাঁধা হয়ে যায় সৃষ্টি চক্রের অন্তর্লীন প্রবাহে-
"তোমার প্রবাহ আছে
আছে সিক্ততা
অর্ধেক পৃথিবীকে গর্ভে নিয়ে
এগোতে পারো দিগন্তের দিকে।"
সমকালে (সত্তরের উত্তাল দশক পেরিয়ে বিশেষতঃ নব্বই দশকে) বাংলা কবিতার বলয়ে মাথা তুলেছে শরীর,শরীরী-চেতনা। যেমন- বিভাস চৌধুরীর 'শরীর কবিতায় পাই-
"শরীর স্বভাব কবি
এসো প্রেম প্রেরণা যোগাই ... "
সেখানে কল্পোত্তমের কবিতাতেও তা এসেছে। তবে তার অভিমুখটিতে পাই ভিন্নতা ও অভিনবত্ব। নর-নারীর আবহমানের প্রবর্তনায় নারী কামনা-বাসনা চরিতার্থতার এক চিরন্তন আধারই শুধু নয়। তার প্রবাহ আছে । গতিশীল জীবনধারার তথা সৃষ্টি চক্রের অংশভাগী হয়েই এই প্রবাহ। এই প্রবাহ শুষ্ক নয়, এর আছে সিক্ততা। এই সিক্ততা সজীবতায় ও জীবন-সম্ভাবনায় পরিপূর্ণ। শরীরী আশ্লেষে পৌরুষ আকাঙ্ক্ষার অবগাহনই শেষ কথা নয়। সৃষ্টির প্রবাহকে অব্যাহত রাখা, গর্ভস্থ ভ্রূণকে নিয়ে আগামীর পৃথিবীকে বহন করে নতুন উত্তরণের দিগন্তে পৌঁছে দেওয়াটাও তার আরেক নিহিত প্রেরণা সঞ্চরণ।
মহাভারতের দ্যূতক্রীড়া দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ প্রসঙ্গগুলির আধারে কবিতায় এসেছে সমাজ-রাষ্ট্রের ভাঁজে ভাঁজে ওৎ পেতে থাকা জটিলতা আর সেখানেই ফুটে উঠেছে আধুনিক জীবনে বয়ে-চলা মানুষের স্বার্থান্বেষী অন্ধকার দিকটি ও তার অসহায়তা ---
"প্রত্যাশার আঙিনায় বসে
তুমি গুটি সাজাচ্ছো
রং বদলের।
কেমন করে হারানো যায়
পাণ্ডু পুত্রদের।"
* * *
..........ভাবছো
কেমন করে অনাবৃত করা যায়
দ্রৌপদীর শরীর।"
মহাকাব্যের চিত্রটিকে বর্তমান সমাজ জীবনের মর্মান্তিক ট্রাজেডির মর্মমূলে স্থাপনে কবির দক্ষতার পরিচয় মেলে --
তোমার সুপ্তবাসনা
আজও অলিতে গলিতে,ঘরে ঘরে
অনাবৃত করছে নারীদের।
অসংখ্য তুমি
হাসছো অবলীলায়
অসংখ্য পান্ডুপুত্রেরা কেঁদে যাচ্ছে
চরাচরময়। "
মহাকাব্যেরই শুধু নয়, মঙ্গলকাব্যের থেকেও লোকপ্রিয় প্রসঙ্গ উঠে এসে এই কাব্যগ্রন্থের কবিতায় সাফল্যের সঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে।
লক্ষীন্দরের মৃতদেহে প্রাণ ফেরানোর জন্য বেহুলার কলার মান্দাসে ভেসে যাওয়া, ইন্দ্রের সভায় নৃত্য প্রদর্শন, মনসামঙ্গলের এই রূপকল্পটি আধুনিক অনুষঙ্গের ইঙ্গিত-তাৎপর্য-অভিঘাতে কবিতায় উঠে এসেছে-
"তোমাকে নাচতে হবে না
আমাকে ফেরানোর জন্য
ইন্দ্রের সভায়।
* * *
ভয় করে
একালের দেবতারাও
ধর্ষণে জড়িত।"
গড্ডালিকা প্রবাহের কাছে, সময়-সমাজের প্রবল চাপের মুখে “অসহায় আত্মসমর্পণ কবি-মন মানতে চায়নি, শেষ দেখে নিতে চেয়েছে। চরম পরিনতির জন্য বিচলিত বোধ করেনি। স্বস্তির চেয়ে শ্রেয়কেই শিরোধার্য করার বার্তা কবিতায়। কালের গর্ভে অস্থিপঞ্জর বিলীন হয় তো হোক। তাই নির্দেশ---
"কলার ভেলা থেকে নেমে পড়ো
খসে পড়ুক এক একটা হাড় স্রোত-গর্ভে। "
স্পষ্টভাবে না হলেও এখানে যেন দধীচির অস্থির আভাষ ফুটে ওঠে।
বৈষ্ণব পদাবলীর চর্বিত চর্বণ না করেও বৈষ্ণবীয় ভাবধারাকে স্মরণে রেখে প্রেম-চেতনায় মানবীয় সংরাগে অপূর্ব লাবণ্য ঝরে পড়ে ' ঘাট ' কবিতায়---
"তোমার পিছল ঘাটে
বনমালী ডুবেছে বার বার
আমার সাধ্য কি পাশ কাটি
এ ঘাট তোমার।"
তবে এ পিছল ঘাটে উঠছে---
"ছলাৎ ছলাৎ ঢেউ
দিয়ে যায় বাঁধ ভাঙা সুখ
দিয়ে যায় স্মরণ সাত সংসারের।"
আবার---
"তোমার আট অঙ্গের ছোঁয়ায়
রাঙিয়েছো আমার আট অঙ্গ বারবার"
এ কথা বলার পরও কবির মোহমুক্ত আত্মদর্শন জেগে ওঠে---
"যে শরীর দিয়ে
আটকানোর কথা ভেবেছিলে
তারও মাঝে খামতি খুঁজে পায়
উদাস বাউল।"
তবে এই দুই বৈপরীত্যও যেন এই কাব্যগ্রন্থে মিলে যায়---
"খাঁচা আর খোলা আকাশ
এক হয়ে যায়
মায়ামুক্ত পাখির।"
বহুমুখী প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায় বিভাজন কবিতাটিতে৷ আমাদের দ্বৈত সত্তার নিত্য চলাচলটি খুঁজে পাই এতে। এ এক প্রবৃত্তি নিবৃত্তির দ্বন্ধ---
"তোমার ইচ্ছায়
মেনে নিয়েছি বারবার
বারবার পালটেছি নিজেকে
তোমার কাছে থাকবো বলে।"
কবিতাটিতে কবির খেদ শুনি স্রষ্টা আর সৃষ্টির মাঝে দেওয়াল খাড়া হয়ে গিয়েছে বলে---
"মনে এক আচারে এক
তোমার এই দ্বিচারিতায়
খাড়া করেছ দেওয়াল
আমাদের মাঝে।"
বড় আমি আর ছোট আমির দ্বন্ধ রূপেও কবিতাটিকে দেখা যেতে পারে।
ভারতীয় জীবনধারায় ও প্রতীতিতে শূন্যের দর্শন বিশেষ স্থান জুড়ে আছে। এ কাব্যগ্রন্থেও তার ছোঁয়া আছে---
"অন্ধকারের মুখোমুখি এসে
আমাদের আন্তরিক আলাপ
শূন্যতার ধারাপাত " ।
এই কাব্যগ্রন্থের কোন কোন কবিতা প্রথমে সাধারণ বিবৃতি বা ঘটনা দিয়ে শুরু হয় পরে সেটি মনোময় বা মনগত হয়ে উঠে, অন্তিমে সেটি সবকিছু ছাড়িয়ে এক অতলস্পর্শী গভীরতায় টেনে নিয়ে যায়। 'ছাপ', 'মেরুপ্রদেশ', 'ষড়পদী' কবিতাগুলি এই জাতীয়। কোন কোন কবিতা মগ্নচৈতন্যে ডুব দেওয়ার কথা বলে। মগ্নচৈতন্যের আলো-ছায়ায় অনুসন্ধান ছাড়া এগুলির কূলকিনারা পাওয়া দুষ্কর।
পরিশেষে কাব্যগ্রন্থটির শেষ কবিতা 'জ্যামিতি'। মানবজীবনের সঙ্গে জ্যামিতিকে অন্বিত করে কবির যে রসোজ্জ্বল দৃষ্টি --- তার প্রসঙ্গ টেনে আলোচনায় ইতি টানবো। সেটি এরকম---
"দুই বৃত্তের মাঝে স্পর্শক আঁকেনি
এমন নারী পুরুষ
মনে হয় বিরলতম।"
নিবিষ্ট পাঠকেরা বইটি সংগ্রহ করে আদ্যোপান্ত পড়বেন আর এর রসোজ্জ্বল মণিমুক্তোগুলি একটি একটি খুঁজে নেবেন। মতামত জানান। পরবর্তীতে রসগ্রাহীর আলো ফেলে কল্পোত্তমের কাব্য ভুবনটিকে নিবিড় করে চিনে নেওয়া যাবে।

0 মন্তব্যসমূহ