বত্রিশ নম্বর জাতীয় সড়ক


১.
গৃহস্থের ভিতর পা রাখতে রাখতে
দখল করে নিচ্ছো জায়গা
দখল করে নিচ্ছো বাস্তুভিটে আমাদের।

আমরা কোথায় যাবো?
জন্ম থেকে বড়ো হয়েছি, সেই ভিটে ছেড়ে
কোথায় যাবো মরণকালে?

নতুন ঘর পুরনো হলো
হাড় ভারি হয়ে এলো মাহাত মাহাতানীর
তাদের লাগানো গাছের সারি
ডাল বিস্তার করতে করতে ছেয়ে ফেললো
ঝিঙে খেতের একাংশ,
সেই অসময়ে ঘর ছাড়তে বাধ্য হওয়াটা
কত যে দুশ্চিন্তার
কে বোঝাবে কাকে?


১৬/১/২০২১

২.
বিধবা সর্দারনীর কেউ নেই সাতকুলে
যা ছিল খানিকটা জমি, একটা ঘর
থাকার জন্য ছিল সে নিজে আর
গুটিকতক মোরগ মুরগি।
সকাল বিকেল এরাই চিৎকার করতো
পাড়াময় শোনা যেত তাদের নিয়মিত বার্তালাপ
শোনা যেত চুপি চুপি বিধবার কাপড় কাটতে আসা
ইঁদুরদের আঙুলের ছাপ পাঁচিলে পাঁচিলে
নখরের দাগ লেগে থাকতো  
ডালায় রাখা ফল আর শিকেই রাখা  
পরিপক্ক কুমড়োর এখানে ওখানে।

তার বেড়া ভাঙলো, রাস্তা সম্প্রসারণের কাজে
মুরগি রাখার চালা, কাপড় মেলার আলনা
গুঁড়িয়ে দিল সরকার।

এই সড়ক দিয়ে কোথায় যাবে বিধবা সর্দারনী?
তার যেটুকু রাস্তা ছিল যাওয়া আসার
সব কেড়ে নিয়ে, এই তো রাস্তা
ধারে ধারে মানুষ চলাচলের ফুটপাত।

তবে কি মাঝখানটা পুরোটাই অমানুষের দখলে?


৩.
রাস্তা চওড়া করায় জমি গেল, বেড়া গেল
সমস্ত আবরু অধিগৃহীত হয়ে গেল বিনা বাধায়,
ইঁদুর, বাঁদর, ভাম, বিড়াল আটকানোর
যাবতীয় বন্দোবস্ত সরকারিভাবে তছনছ হওয়ায়
আবছা অন্ধকারেই চৌচির হয়ে গেল
সযত্নে গুছিয়ে রাখা বিধবার শাড়ি।

এইভাবে ছেঁড়া শাড়ি সেলাই করা যায়?

বিধবা আর ভাবে না
কতদিন কাঁদতে কাঁদতে শুকিয়ে আসা চোখে
কাঁদেও না, চওড়া রাস্তা দিয়ে ছুটে চলা ট্রাকের 
চাকার দিকে তাকিয়ে থাকে রোজ।

তুই আমার শেষ ভরসা
শরীরে নতুন কাপড় দিতে পারবি একমাত্র তুই।


৪.
পুরনো রাস্তার ছাপ আর থাকবে না
থাকবে না পুরনো গাছ
আমাদের পুরনো ঘর।

মাটির ঘর চৌদ্দ পুরুষের সংসার সামলালেও
আসে না সংরক্ষণের আওতায়।

ভিটের একপাশ খুঁড়লে এক প্রজন্মের
অন্যপাশ খুঁড়লে অন্য প্রজন্মের ভিত বেরিয়ে আসে
বেরিয়ে আসে তাদের আঙুলের ছাপ
বেরিয়ে আসে সেই প্রজন্মের
প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন।

অধিগ্ৰহণে ভিটেটাই চলে গেল আমাদের।
আমার ছেলে বা নাতিরা
হাজার খুঁজলেও
খুঁজে পাবে না সেইসব নিদর্শন
তাদের পূর্বপুরুষদের দাগ।


৫.
অন্যের দাগ মুছে দাগ রেখেছো নিজের
অন্যের ভিটে ভেঙে ভিত গেড়েছো নিজের
তোমারও ভিটেই ভিত গাড়বে কেউ একইভাবে,
কোনো একদিন খুব ভোরে ভেঙে গেলে ঘুম
অসম্ভব রুদ্ধশ্বাসে বিশ্বাস করতে হবে তোমাকে
তোমারও চৌদ্দ পুরুষের  
ভিটের উপর পেরিয়ে গেছে  
কোনো এক চওড়া সড়ক।

চাকার গতি যতদিন
কখনই থাকার নয় টানা
উপর কিম্বা নিচে চাকার কোনো পাশ

যতই থাক প্রতিরোধ তোমার
পালা বদলের গান আসবেই ভেসে।


১৭/১/২০২১

৬.
জোর করে অধিগ্ৰহণের পর হাতিয়েছো সব যার পাগল করেছো যাকে ভিটে থেকে উৎখাত করে 
যার নিচে বেঁচে আছে অনন্ত মেঠোপথ
যার নিচে সব শব চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলে
পাল্টে দে পাল্টে দে
পাল্টে দে সমস্ত সিগন্যাল
তার আর কি নেবে?

বিষয় মুক্ত হলে
বিষয়হীন বাঁচতে শেখে মানুষ,
বিষয়হীনতাও আরেক আধার,
হারাবার ভয়হীনতা বিরাজ করে সেখানে।

একদিন রুদ্ধ হলে সব পথ, সমস্ত সিগন্যাল ভেঙে  
একা একা হেঁটে যাবে সে 
তোমাদের রাজসিক রাজপথে করে যাবে প্রতিবাদ,

আমাদের পাজামার ছেঁড়া অংশ জুড়ে 
তৈরি হওয়া জাতীয় সড়কে বলো কার ওঠা মানা?


৭.
হুইসেল বাজিয়ে চলে যায় বাস
খালাসির চিৎকার, বেড়াদা বেড়াদা
কে আছো বেড়াদা?
আসন ছেড়ে উঠে পড়ে কেউ কেউ।

গন্তব্যে পৌঁছে গেলে
আসন ছাড়তে হয়, অন্যের দখলে
চলে যায় আসন। যতটুকু পথের অংশীদার তুমি
ততটুকু পথ সঙ্গে সঙ্গে থাকা
অন্য সব যাত্রীর।

মুহূর্তের পরিচয়, মুহূর্তেই এক হয়ে যাওয়া
তারপর সমস্ত পরিচয় হারিয়ে
চলে যাওয়া নিজের নিজের বাসায়

চিরকালীন থাকার অনুমতি দেয় না মাঝপথ।


৮.
কত বাস কত লরি কত লোকজন
নিজস্ব ঠিকানার খোঁজে 
চলে যায় এপাশে ওপাশে

মাঝপথে স্নান সারে, মাঝপথে রান্না সারে কেউ
কেউ লুটে সম্পদ, শরীরের গন্ধ লুটে কেউ  
লুটে কোমলতা, লোভনীয় শারীরিক ভাঁজ
ভিড়ে ঠাসা বাসের ভেতর।
অন্ধ বাঁকু গান গায় তারই মাঝে, চলন্ত বাসে,
আমি কাঙাল দয়াল গুরু
আমার মন তো কাঙাল নয়।

বাইরে থেকে আসা, তবু
বাইরেই থাকে শুধু চোখ
অনেকেই আছে, গেট ছেড়ে যাবে না কিছুতে
পাছায় ঠেকবে পাছা আগন্তুক যাত্রিণীর
পায়ের উপর এসে পড়বে তার পা
হঠাৎ মেরেছে ব্রেক
বৃহোদরার ভার এসে পড়েছে শরীরে
প্রাণপাখি যা বেরিয়ে যা!


৯.
কত কত বৃক্ষ সমূলে বিনাশ হলো
কত কত বীজ মাটির গভীরে গেল দেবে
অঙ্কুরিত হওয়ার আগেই।
কত কত চারাগাছ, বাড়ার ইচ্ছা নিয়ে
কোনোক্রমে বেঁচেছিল, ছাগলের মুখ থেকে
বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে, শেষ রক্ষা হলো না তাদেরও।

পড়ে আছে ভাঙা গাড়ি রাস্তার ধারে
কেউ নেই, কেউ ছিল, জুতো তার
পড়ে আছে একপাশে,
রাস্তায় খাবে বলে রেখেছিল তেলেভাজা
ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, লেগে আছে পিঁপড়ের সারি।

এইটুকু বাঁশি! নিশ্চয় কচি মুখে দিয়েছিল প্রাণ
পড়ে আছে সেও আজ গতির প্রমাণ।


১০.
বকেদের বাসস্থান ছিনিয়ে নেওয়া রাজপথে
বক কি হাঁটবে? 

যতই চওড়া হোক, হোক চকচকে
ফিঙেদের গান, শালিকের কিচিমিচি
বুলবুলির টিকটড়ক শোনাবে না,
জাতীয় সড়কে এসে দাঁড়াবে না বেনেবউ।

করঞ্জা তেঁতুলের সারি, আম জাম বট
অশ্বত্থ পলাশ আর কত কত প্রাচীন প্রাচীন গাছ
পাখিদের ঠোঁট, নখের চিহ্ন আর
বিষ্ঠায় বিষ্ঠায় ধরেছিল ভিন্ন এক রঙ
তাদের পাবে না তুমি। 
পাবে শুধু ছোটো বড়ো গাড়ি
তাদের পেরিয়ে যাওয়া, পুঁকপাঁক
তারই মাঝে অপেক্ষারত সব  
অসহায় মানুষের দল।


১৮/১/২০২১

১১.
পাখিদের কলরবের বদলে
রাতদিন কানে আসে মোটরের হর্ণ পুঁকপাঁক
চাঁদ তারার আলোর বদলে আসে দূর দেশে ছুটে চলা
বাস, ট্রাক, প্রাইভেট মোটরের আলো।

প্রচন্ড রোদ্রেও পড়ে না আর বৃক্ষের ছায়া
প্রশস্ত রাজপথে, দেখা যায়  
উড়ে এসে জুড়ে বসা ধুলোর সংসার 
ছোটো বড়ো ঝোপ আর আগাছার গায়ে।

তুমি আছো, আমি আছি
দু'পাশে ছড়িয়ে থাকা বৃক্ষেরা নেই,
কারো কারো অবস্থান পরিস্ফুট করে আছে
অর্ধেক জীবিত মূলরাশি।  

তাদের বেরিয়ে আসা ডোগা
এখনও স্বপ্ন দেখে আকাশ ছোঁয়ার।


১২.
কপলেনে খুঁড়ে দিল কেটে ফেলা গাছেদের মূল
তাদের শক্ত ভিত সরিয়েই ভিত্তি হলো
চওড়া সড়কের।

এ সড়ক জানে, কিভাবে থাকতে হবে শুয়ে
কিভাবে জানাতে হবে নিজের ওজন
কিভাবে জুড়তে হবে  
এক শহরের থেকে আরেক শহর।

গ্ৰাম তো কুড়োই পাতা শুকনো কাঠ
কাটে কাঁচা ডাল ছোটো ছোটো
শহরেই তৈরি হয় পরিকল্পনার
ধারাবাহিক বৃক্ষ ছেদনের।

বৃক্ষও জানে ভালোভাবে, বৃক্ষরোপণ উৎসব
আরেকটা খেলারই নাম।


১৩.
বত্রিশ, তেত্রিশ, ছেষট্টি যাই হও
গ্ৰামের মাটিকে খেয়ে সোজা গিয়ে শহরেই ঢোকো
উগরে দাও বর্জ্য সব আনাচে কানাচে।

গ্ৰাম কি এখনও জানে
কিভাবে হজম হয় ফেটে যাওয়া ছেঁড়া প্লাস্টিক
জলের বোতল আর আরও আরও
এইসব আবোল তাবোল।

পকেটেই নেই যার তার আবার
পকেট মারির ভয়?
তালি দেওয়া পেন্টে দেখো কোথায় রেখেছে দুটো
কানাকড়ি রাতদিন খেটে।

মুরগা বানানো যায় মানুষকে
সেও এক পেশা
অসহায়ের ঠিকানা বিকিয়ে টাকা
উপার্জনও কারো কারো নেশা
এসবই শহর দিল চওড়া পথে ছড়িয়ে চারপাশে,
এখনও ঋষির পা শান্ত নদীর তীরে
গজানো সবুজ ঘাসে ঘাসে  
শিশিরের মতো পড়ে টুপটাপ
এখনও সময় আছে গ্ৰামকে গ্ৰামের মতো
থাকতে দাও চুপচাপ।


১৪.
জাহাজও রাজপথে চলে
এই অবিশ্বাস্য কথা
বিশ্বাস করতে হবে একবিংশে
উভচর প্রাণীদের দেখাদেখি উভচর গাড়ি
ছুটছে তো ছুটছেই 
জল, ডাঙা, মেঘরাজ্যে।

কি আবার দাঁড়িয়ে পড়া?
সাবলীল গতি, দরকার নেই আর দাঁড়াবার
ছুটবার পালা তোমার আমার
চওড়া সড়ক তাই সবকিছু খেয়ে খেয়ে
দূরন্ত বেগে ছোটা সরিসৃপ।

কাঠও হজম করে, পাতাও হজম করে
হজম করছে ঘরবাড়ি অনায়াসে
আমরা উড়ছি আজ এপাশ ওপাশ
এদিক ওদিক থেকে ছুটে আসা বাতাসে বাতাসে।


১৫.
রাস্তার ধারে ঘর, যে বলরাম চিৎকার করে 
ছেলেদের বলে যেত বার বার
দূরে আয় দূরে আয়, রাস্তা থেকে দূরে আয়
সত্যি আজ দূরে গেল তারা,
রাস্তায় খেয়ে নিল ঘরদোর
টাকা দিয়ে ছুঁড়ে দিল পুকুরের পাড়ে।

রাস্তার পাশে যেতে ইচ্ছে জাগে
বুড়ো বলরাম, জোয়ান ছেলেকে বলে
কপাল খারাপ তোর, একটুও জমি নেই
চওড়া এই রাস্তার পাশে।

চাকার আওয়াজ 
কখনও মন্দ লাগে
কখনও দেখায় মনে আলো,
রাস্তাটা চওড়া হয়ে
যাই বা হয়েছে যার
বলরাম, সীতারাম, হরেরাম, নিধিরাম সহিসের মতো
কত কত নিভূমির কপাল পোড়ালো।


১৯/১/২০২১

১৬.
যেদিকে বাতাস বহে সেদিকেই যাই,
বিপরীতে বালির আঘাত বড়ো 
তাকাবার ক্ষমতা আমার নেই
না-তাকিয়েও পাই ব্যথা পাই।

এভাবেই চলে দিন
আশায় আশায় থাকি লাইনে লাইনে
সবকিছু চলে যায় ডাইনে আর বাঁয়ে
ঐ তো পেরিয়ে গেল বাজিয়ে সাইরেন
আমার দেশের কোনো বিশুদ্ধ নেতা 
কোনদিন বামে থাকে কোনদিন ডানে
অঙ্ক লোভাতুর হলে পাল্টুরাম হয় সে সটানে।

আমার তোমার দিকে দৃষ্টি পড়ে
পঞ্চসালে একবার
বাকি সব সময়েই দৃষ্টি যায় উপরে উপরে,
সাক্ষর শতভাগ, অক্ষরজ্ঞান নেই শুধু
পাকা বাড়ি সবাকার
বর্ষায় ইটগুলো গলে হয় মধু।

সাইকেল, ককটেল, মটকেল দিয়ে দিয়ে
আমার সাধের ঘরে আমার থাকায় হল দায়

সবাই বলছে ব্রিজ
আমি তো দেখছি শুধু রাই।


২০/১/২০২১

১৭.
আমাদের মুরগার উপর  
মাঝে মাঝেই চলে যায় দ্রুতগামী লরিদের চাকা
চলে যায় আমাদের উপর দিয়ে।
একটু চাষ, দু'টা গরু-ছাগল, দু'টা হাঁস-মুরগাই 
আমাদের জীবন, আমাদের সংসারের ওঠানামা
তার উপর দিয়ে চাকা চলা মানে
কার উপর চাকা চলা বলো?

একটা মুরগার উপর চাকা চাপিয়ে তোমরা  
দেখতে পাও রাস্তার উপর পড়ে থাকা মৃত মুরগা
আমি দেখতে পাই রাস্তার উপর পড়ে থাকা
সেই সংসারের মৃত অর্থনীতি।

আমাদের স্বাস্থ আর অর্থনীতি  
চাঙ্গা রাখার ভার
মুরগার উপরেই দেওয়া থাকে অনেকাংশে
দেওয়া থাকে ভেড়া ভেড়ি গরুদের কাঁধেও।


১৮.
বাঁকা সড়ক অনেকটাই সোজা হলো
দৃষ্টিগোচর হলো পাশাপাশি গ্ৰাম
রাস্তার ধারে ঘর বাড়তে বাড়তে
বেড়া হলো দু'পাশে।

দূরের মাঠঘাট, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পাহাড়
হাবুদের জলা, বিশুদের তালসারি
নিতু আর অনুদের জলে আধো ডোবা
আড়াল হতে হতে চলে গেল মনের আড়ালে।
ঘুম ভেঙে রাতে দেখি
পর পর ছুটে চলা আলোয়
কখনও হারিয়ে যায় কখনও বেরিয়ে আসি আমি,
দিনে দেখি, অস্পষ্ট হয়ে গেছে গলার আওয়াজ
দ্রুতগামী গাড়ির আওয়াজে।

বহুকাল আগে, ঘরের সামনে আমি বানিয়েছি রাস্তাটা
লোকে বলে আজ, রাস্তার ধারে আমি থাকি।


১৯.
ঘন ঘন সাইরেনের আওয়াজ বুঝিয়ে দেয়
দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েছে নির্বাচন
প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি জানিয়ে দেয়
বুথে যাওয়া তোমার আমার  
বিশেষ জরুরী।

পিছনে যায়গা নেই,
একটু একটু করে গিলে গিলে
কড়াই আর ঝাঁঝরা রাখার মতো
জায়গাটাও পেটে গেল সড়কের
চপ বিকে পেট চালা দায় হলো
কোন্ নেতা বোঝে তা?

চানু মোদকের ছেলে জায়গার নামে পাওয়া
কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা নিয়ে রাস্তায়, চিন্তিত
বসে খেলে এক নদী বালিও ফুরায়।


২০.
আমার ঘরের চারপাশে
বিছিয়েছো ধূলার চাদর
আমার মনের চারপাশে আতঙ্কের,
কেঁচো থেকে জল ঢোঁড়া 
জল ঢোঁড়া থেকে অজগর হয়ে উঠছো দিন দিন।

বিবর্তনের নিয়মে অজগর এনাকোন্ডা হলে
ভিটে ছেড়ে পালাতে হবে আমাদের।

জঙ্গল থেকে তাড়িয়েছো মাঠে,
মাঠ থেকে তাড়ালে
কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো?

নিজের ভিটে মাটি বাঁচাতে
আমাকেও বিবর্তিত হতে হবে এনাকোন্ডায়।


২১.
আমাদের ভিটে থেকে অনেকটা উঁচু হলো রাজপথ আমাদের ঘরের দিকেই আসে রাস্তার জল
উল্টে পড়া গাড়ি আর পাশ কাটানোকে নিয়ে
গাড়িওয়ালার যত ঝগড়ার গালাগাল।

কোথায় দাঁড়াবো গিয়ে,
কোথায় ঘুমাবো আমি গভীর নিদ্রায়?
লরির আওয়াজ এসে ঘন ঘন
কষ্টে আহরিত আমার  
ঘুম নিয়ে যায়।
সকালেই উঠে দেখি ধুলো ধুলো ধুলো
ধুলো পায়ে হাঁটছে লোকগুলো
আগাছা, কাঁটা আর রুগড়ি পাথরে ভরা ফুটপাতে,
জায়গা নেই এতটুকু 
চকচকে পিচে, সাধ্য নেই
ধুলো ভরা পা নিয়ে সেখানে কেউ হাঁটে।


২১/১/২০২১

২২.
কালো পিচের উপর জমাট বাঁধা রক্তের দাগ
আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দেয়
কম নেই আমাদের গতি।
কালো টায়ারের গায়ে জমাট বাঁধা রক্তের দাগ
আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়
গতিই শেষ কথা। তোমার আমার মতো
মানুষের প্রয়োজন টায়ারের নিচে।

যতই হলদে হোক, যতই গভীরে থাক শেকড়
শিল নোড়ায় পিষ্ট হতেই
জন্ম হয় হলুদের।

আমাদের প্রয়োজন
বাকিদের জীবনের গতিধারা রঙিন বানাতে।



২৩.
যে আল দিয়ে আটকেছি গড়িয়ে আসা জল
সেই আল নেই আর
যে আলে ভাত খেতে দিয়েছিল মা
সেই আল নেই আর
নেই পুরনো সেই ইঁদুরের গর্তের মুখ।

কত যে ধানের শিষ এলোমেলো
পড়েছিল গর্তের মুখে
কত যে ইঁদুর ছিল
চাষিদের মহা সুখে দুঃখে,
সব গেল কে কোথায়
চেইন পোকলেন এসে ভেঙে দিয়ে আল
বিছালো বিছানা
কালো ঐ পিচ রাস্তার।

রাস্তার জল এলো খেতে,
ফোঁটা ফোঁটা তেলের আস্তর
মাটিকে দূষিত করে
কমালো ফসল
গাছের শেকড় গেল পচে

পাতা শুকোয় ডাল শুকোয়
শুকোয় সবার থেকে উঁচু ডোগা, তাই দেখে
চাষিদের চোখ ছলোছল।


২৪.
এক একটা গ্ৰামের হৃদয় ফুঁড়তে ফুঁড়তে
রাজধানীর দিকে এগিয়ে যায় জাতীয় সড়ক
এগিয়ে যায় আমাদের ভিটের উপর দিয়ে
তাদের দুয়ারে।

গাড়ি থেকে নামলেই বেডরুম 
গাড়ি থেকে নামলেই ওপেন টেরেস
গাড়ি থেকে নামলেই পানশালা, পার্বতী-মহল থেকে
পৌঁছে যাওয়া গঙ্গার বুকে।

আমার ভিটের দাম এইটুকু, সমসাময়িক
সরকারি দরের চেয়ে সামান্য বেশি টাকা
কোনমতে একবার দেওয়া।

কোথায় দাঁড়াবো আমি ঈশ্বর জানে
কোথায় ঘুমোবো আমি ঈশ্বর জানে
দিন রাত জ্বলে শুধু চিতাকাঠ
বুকের মাঝখানে
চওড়া সড়ক শুধু আমাদের প্রিয় এইখানে।


২৫.
চওড়া সড়ক দিয়ে মল এনে  
ঢেলেছো নদীর স্রোতে
ঢেলেছো ঝোপের কাছে 
আমাদের খালি পড়া বাগিচায়
নরম ঘাসের এই গালিচায়
আমাদের বুকের উপর।

বিজ্ঞান মনস্ক তোমাদের প্লাস্টিক 
খেয়ে দেখে আমাদের পশু,
গবেষণা করে তারা, দেখে
ডিজিটাল যুগে এসে তাদেরও অন্ত্র
প্লাস্টিক টানে কি না টানে।

বিজ্ঞান রিসার্চে মারা যাওয়া দেশের গৌরব
গরুও গবেষক এই দেশে
আমরা তাই খুঁজে ফিরি জীবনের মানে।


২৬.
আগুড় খুলতেই বেরিয়ে আসে মোরগ
বেরোতেই বেরিয়ে আসে প্রাণ
টিউবলেস চাকার তলায়, খন্ড খন্ড
মাংসের পিন্ডগুলো চটকাতে থাকে
সারি সারি ছুটে আসা বাস লরি,

মতিলাল দেখে, কেমন করে
নষ্ট হয় সাত আট মাসের পরিশ্রম
কেমন করে মুছে যায় রক্তের দাগ
পরপর ছুটে চলা চাকার ঘর্ষণে।

আগুড়টা খুলতেও ভয় করে
না খুললে আলো আর হাওয়া বলো
ঢুকবে কোথায়?

খুলতেই হবে
না খুলেও অবস্থা তাই, প্রাণ যায় যায়,
আসুক শব্দ যত, ধুলো, ধোঁয়া
সবকিছু বুঝে নেবে মতিলাল কড়ায় গন্ডায়।


২২/১/২০২১

২৭.
জাতীয় সড়ক এক সর্বভুক
বৃক্ষ লতাপাতা, সামনের মাঠঘাট, পুকুর
রাস্তার ধারে থাকা ঘরবাড়ি
পশুপাখি খেতে খেতে
হয়ে ওঠে স্থূল দিন প্রতিদিন
প্রতিদিন হয়ে ওঠে অচিন অচিন।

খসখসে থেকে হলো মসৃণ
গায়ে হলো হলদে সাদা ডোরাকাটা দাগ
রাস্তায় গিয়ে আর কাজ নেই
প্রাণ যদি রাখবি তো ভাগ মিলখা ভাগ।

পালিয়ে বাঁচার আর জায়গা কই?
পিছনে অন্য প্লট, যতবার মাপে তারা
এক কড়ি এক কড়ি করে করে
যেতে চায় সড়কের দিকে,
রাস্তার মোহ যে লেগেছে তার
রাস্তার পাশে এসে ছিঁড়েনি যে শিকে।


২৮.
কোনো গাড়ি লাল আলো কোনো গাড়ি নীল
ঘুরে ঘুরে জ্বলে যায় ঝক ঝক
কোনো গাড়ি সাইরেন 
কোনো গাড়ি ঢং ঢং ঘন্টা বাজিয়ে চলে
এদিক ওদিক করে পাশ নিয়ে
দ্রুতবেগে চলে যায় ফক ফক।

বলরাম তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে
চশমার ফাঁকে
কল্পনায় কত ছবি আঁকে, জীবনে
কত কি দেখার আছে বাকি
তাই মনে হয়, রোগে শোকে
মরতে মরতে বেঁচে থাকি।

শুধু এক পথরেখা জঙ্গলের মাঝে
আলোও ছিল না কোনো সাঁঝে
সেই পথ পিচ হলো
দেখতে দেখতে হলো ডোরাকাটা দাগ
ভরে গেল আলোর মালায়,
দেখার আশায় শুধু থাকি
কে জানে আরো কত বাকি?


২৯.
জাতীয় সড়ক জানে কোন্ ছলে খেতে হবে কাকে
কোন্ ভাবে রাখবে বাঁচিয়ে
রাখতে চায় যাকে,
শোয়ার জায়গাটুকু সোজা করে নিতে
কাউকে গিলেছে পুরো কাউকে গিলেছে আধা
কাউকে গিলেছে দেখো সামান্য এতটুকু
বাঁচিয়ে রেখেছে প্রায় পুরোটাই।

পাতালেশ্বর বাবা বেড়াদার
ত্রিনয়ন খুলে গেলে ছারখার
তাকে কি গিলতে পারে রাজপথ
রাজপথ সরে গেল নিজে তাই।

দুধ ঢালে জল ঢালে মন্ত্রি, আশায় আশায় দেয় 
ফুল-বেলপাতা, দূর্বা-মুকুল দানা
চন্দনের টিকা নেয় মস্তকের ঠিক অগ্ৰভাগে,
মন্দিরে, হাত লাগানোর আগে
হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে
সমর্পণ করে দেয় যন্ত্রি
হে প্রভু, কর্ম আমার এই
হাত লাগাতেই হলে
ক্ষমা তুমি করে দিও আগে।

স্থাপিত দেবদেবী তুলে ফেলে পিছনে সরালে
সরে না ডমরুধারী পাতালেশ্বর
উল্টো দিকে সরে গিয়ে রাজপথ
আমাকে মরালে।


৩০.
রাত ন'টা বাজতেই  
রাজপথের ধারে ঘুমিয়ে পড়ে মাটির বাড়িটা
রাত ন'টা বাজতেই
ঘুমিয়ে পড়ে সে বাড়ির কবিতা লেখা কলম।

পুঁতির মালার মতো আলো
মাটির দেওয়ালে এসে পড়ছে জোরালো বার বার
ঘন ঘন কাঁপছে বাড়িটা লরির আওয়াজে।

ঘুমে তবু আসে না ব্যঘাত 
এতটা গভীর ঘুম চাইলেও পায় না সকলে
সে কবির ঘুম ভাঙে
ফুটতেই সমতলে আলো,
রাত ন'টা বাজতেই
স্বপ্নে গরুর পাল নদী তীরে এসে
বলে যায়, ছন্দময় কবিতা রসালো।


৩১.
কার কাচ ভেঙে গেছে
কার আলো নিভে গেছে
কোন্ চালকের ঘুম 
লেগে গেছে গতিশীল ট্রাকে
বোঝার উপায় নেই, তাই ফাঁকে ফাঁকে
পা ফেলে দূরে দূরে হাঁটি
ঝকঝকে রাজপথ দূরে থাক
সুরক্ষিত ভাবে আগে বাঁচি।

গতি বাড়ে আমাদের,
ততখানি গতি নিয়ে  
ছুটে আসে আমাদের দিকে
ছিঁড়ে দিতে জীবনের শিকে
আঁধারের রাজা,
হিসেবের গরমিল মিলিয়ে মিলিয়ে দেখে
খুলে দেয় গোপন দরোজা।

রাজপথ সাক্ষী থাকে তার
ঘন ঘন আসা যাওয়া তোমার আমার
বসত গড়েছি কতো
কন্যাকুমারীকা থেকে হিমালয়
চিহ্ন পড়ে আছে দেখো তার।


২৩/১/২০২১

৩২.
ফুটপাত ঘেঁষা মাটির বাড়ির চালে
যতখানি ধুলোর আস্তর
পুরোটাই রাজপথ থেকে ওড়া,

আমাদের বাঁচা কণা কণা ধুলোর আশ্রয়ে।

তুমিও উড়িয়েছো আমিও উড়িয়েছি
উড়িয়েছে বেশি
বাদাম পাহাড় থেকে লৌহ আকরিক নিয়ে
ছুটে আসা লরি। বাকি সব বাস লরি
ছোটো বড়ো আর যত দু'চাকা চার চাকা
উড়িয়েছে ইচ্ছে মতো
বসেছে ঘরের চালে গাছের পাতায়।

আমার গায়েও লাগে, প্রতিদিন সাফ করি 
জন্ম থেকে অর্জিত মহা দক্ষতায়
চাল আর গাছের পাতাও 
চকচকে করে নিজেদের
ঝরে পড়া বৃষ্টি কণায়।


৩৩.
গাড়ির টায়ার ফাটে
ধুলোর অন্ধকারে
বুলেটের গতি নিয়ে ছুটে যায়
বালি আর পাথরের কণা,
রক্ত বিন্দু ঝরে ঝরঝর, 
হেঁটে চলা পথিকের গায়ে
বয়ে যায় রক্তের ধারা
ধুলো বালি সরায়ে সরায়ে
আষাঢ়ের নদীর মতোই।

ব্যথা আর কাকে বলে
ধরাতলে ফিতার মতোই
বিছায়ে দিয়েছো পথ
নিজেদের মনোরথ পূরণের
এইসব এক একটা বান
আমাদের মরণ সমান।

কত আর বলি, তোমাদের
আছে অলিগলি
ভারতীয় আইনের ধারা
জিলিপির পারা
এদিকে ওদিকে ঘোরা, তারপর
ঘোরাবার দক্ষতার ওপর
ছোটো বড়ো হনু হয়, পায় বেশি দর
ধারা বিক্রেতারা।


৩৪.
দিগন্ত ছাড়িয়ে যাওয়া রাজপথে
দিগন্তে পৌঁছোবে না, কাছে যেতেই
দূরে যাবে ক্রমাগত, ভন্ডুল হবে জানি স্বপ্নটা
আকাশ ধরার।

কতজন এলো গেল এই পথে
এই মনোরথে, বিফল হয়েছে তারা
পাগলের পারা, তুমিও চেষ্টা করো
দৈববাণী হতে পারে তোমার বেলায়।
আমি শুধু পথরেখা দেখি,
মাঠে ঘাটে ছেড়ে দিলে গরু
মেঘে মেঘে তারা খোঁজে ঘাস,
আমার তো বাঁশি নেই
রোদ-ঝড়-বৃষ্টি গ্ৰীষ্ম-বর্ষা বারোমাস
এই গাছ ঐ গাছতলে
শত শত পাখিদের মতো
খুঁজে দেখি অমল বাতাস।


২৪/১/২১

৩৫.
খালি চোখে এপার ওপার
দূর থেকে আগত সব গাড়ি
দেখেছিল বলরাম সিঙ্গেল রোডে,
এখন তো ফোর লেন
এক সাথে আসা যাওয়া চারটে গাড়ির
তার আবার চশমা লেগেছে চোখে
সবকিছু ঝাপসা দেখে এপারেই 
ওপারের কি আর দেখবে বলো বলরাম?

সময় থাকে না এক
থাকে না দৃষ্টি বরাবর
রাজপথ দিয়ে আসা গাড়ির আলোর মতো
সবকিছু আলোকিত করে
চলে যায় বহুদূরে
বলরাম ডুবে যায় অন্ধকারে
সব কালো এপার ওপার।

রাতদিন জেগে থাকে রাজপথ
রাত ন'টা বাজতেই 
স্বপ্ন দেখে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে
পাশের মাটির বাড়ি
তার মাঝে বৃদ্ধ বলরাম
স্বপ্ন দেখে নিশ্চিত ওপারে যাওয়ার।


২৫/১/২১

৩৬.
জাতীয় সড়ক দিয়ে 
কোথায় নিয়ে যাবে আমাকে?
কোথায় খুঁজে পাবো
যন্ত্রণা লাঘব করার পরিপক্ক কারিগরী বিদ্যা?

বেদনার ভার নেওয়ার অসহায়তা থেকেই
জন্ম নেয় স্বার্থপরতা, স্বার্থপরতাও
চওড়া এক রাজপথ
অপরকে সরিয়ে
ক্রমান্বয়ে চওড়া হয় নিজে।

আমাদের সবজি খেত, ধান খেত, পুকুর, বাগান
অগোছালো পাতকুঁয়ো
হজম করে নিলে সগর্বে,
সগর্বে হজম করে নিলে
এতদিনের গো-চারণভূমি।

আশ্রয় করে বাঁচার মতো
কোনকিছুই কাজ থাকলো না সেভাবে।


৩৭.
শ্মশান হারিয়ে গেল
ঢেকে গেল শ্মশান-মুখি পথ তোমার ডানায়।

শ্মশানে যাওয়াও যদি বন্ধ হয়
দেশ ও দশের মঙ্গলে
মেনে তো নিতেই হবে
জেনে তো নিতেই হবে, কোন্ পথ  
শেষমেশ নিয়ে যাবে
উলঙ্গ রাজার রাজধানী।

ফুটপাত আমাদের
ফুটপাত সেখানেও আছে
সেখানেই থাকতে চাই
নজরে নজরে তাকে রাখতে চাই
আমাদের রাজা যেন
পার্থিব সমরে হয়ে জয়ী
এ রকম ভালো কাজ করে।


৩৮.
কেন্দ্র আর রাজ্যের বিনা খাজনাতে
উলঙ্গ রাজার দেশে মরাও বারণ
শ্মশানে যাওয়াও যদি বন্ধ হয়
চার জনের কি আর প্রয়োজন?

একা থাকি একা শুই সড়কের ধারে
ব্যথাতুর কবির মতোই দাড়ি
বাড়ে শুধু বাড়ে,
সাদার সংখ্যা বেড়ে কালো হয় কম
কবিতা আসে না তবু কবির মতোই থাকি
এই কিসে কম?

লোকে আর যা বলুক আমি পুরো সাদা
তোমাদের সুরক্ষাতেই
দেশটাকে বিকেছি তো আধা!

আর কি বিকলে বলো
বিশ্বাস করবে রাজাকে
সব বিকে দেবে রাজা
যাতে করে প্রজা সুখে থাকে।


২৬/১/২০২১

৩৯.
যোগাযোগের রাস্তা ভুলে গেলে
উঠে এসো জাতীয় সড়কে
এখান থেকেই খুঁজে পাবে পথ
খুঁজে পাবে গন্তব্য।

আমাদের পায়ে চলা পথ
এখানেই মেশে গিয়ে
এখানেই পৌঁছে দেয়,
বাকি পথ হেঁটে যাওয়ার ইংগিত দিয়ে
দাঁড়িয়ে থাকা বৃক্ষের দিকে এগিয়ে যায় সোজা।

পায়ে চলা পথের   
ঘর এক ঠিকানা
বৃক্ষ এক ঠিকানা
যেখানেই পৌঁছাও সেখানেই বিশ্রাম, শান্তির।

রাজপথ অনন্ত ইচ্ছার অপূর্ণ সংলাপ
পূর্ণতার আগেই
শুরু হয় অন্য এক পথ, অন্য এক হেঁটে যাওয়া।


২৭/১/২০২১

৪০.
গ্ৰাম জীবনের ছবি ভাঙতে ভাঙতে
এগিয়ে যাওয়া রাজপথ জানে না
আমাদের অনন্ত শেকড়,
ভেদক যন্ত্রের মতোই
পেরিয়ে যায় সুকঠিন পাথর
পেরিয়ে যায় ইস্পাত।

আমাদের পায়ের নিচে  
যুগান্তর কাল ধরে পিষ্ট হওয়া পথ  
ধুলোয় ঝাপসা হলে প্রয়োজন বৃষ্টির।

বৃষ্টি কে আনবে?
বৃষ্টির দেবতাকে শান্ত করার লায়া
চাকার তলায় পিষ্ট হতে হতে
বৃষ্টি ঝরিয়েছে চোখে।

বৃষ্টি নেই, গ্ৰাম জীবনের ছবিও
পাল্টাবে না মুখ।


৪১.
লক ডাউন দেখিয়ে দিল
রাজপথ গরীবের অনন্ত হেনস্থার
কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে যে কোনো সময়।
যে কোনো সময়  
যে দিকে যাওয়ার তার উল্টো দিকে 
দেখিয়ে বলতে পারে, ঐ দিকে পথ।

পুলিশের লাঠি
সরিষার তেলে নয়, শক্ত হয়
গরীবের পিঠের ঘর্ষণে।

সাথে থাকা বাচ্চার হাতের রুটি   
পড়ে গেছে রাস্তায়   
নেমে আসে পিঁপড়ের সারি 
বাচ্চার হাত আর পারবে না ছুঁতে।


২৮/১/২০২১

৪২.
যে ক'টা পুরনো আম, জাম, নিম
বট, করঞ্জা, তেঁতুলের গাছ 
অভিভাবকের মতো দাঁড়িয়ে ছিল,
ছায়া দিয়ে আসছিল এতদিন 
আজ তাদের চোখে পড়বে না। 

রাস্তা সম্প্রসারণ, রাস্তা সিধিকরণের কাজে
হারিয়ে গেল তাদের ছায়া।

তোমাদের সেতু নির্মাণের আগে 
ছায়া ছিনিয়ে নেওয়া আমাদের
ছিনিয়ে নেওয়া অভিভাবক।

মানুষের বসতি উৎখাতকে উচ্ছেদ বলা হলে
পাখিদের বসতি উৎখাতকে কি বলবে?

আজ কোনো পাখি নেই ডেকে ওঠার
আজ কোনো স্বর নেই এপাশে ওপাশে।


২৯/১/২০২১

৪৩.
রাজপথের ধারে আগুন জ্বালিয়ে
ভোর আনে অম্বিকা মাহাতান
রাজপথের ধারে আগুন জ্বালিয়ে
নিয়ে আসে মুক্তোমালা,
সারি সারি লরির আলোয়
স্পষ্ট হয় তার মাটির ঘর।

মাটির ঘর ভেঙ্গে গেলে কে সারিয়ে দেবে?
মাটির ঘর সারানোর মিস্ত্রি নেই এখন।

চারদিকে পাকা ইটের ঘর, পাকা ইটের মিস্ত্রি
ঝকঝকে চকচকে মেঝে, দেওয়ালের
কোনো কোনো জায়গায় সুন্দর কারুকাজ।

মাহাতানের ঘরে স্পষ্ট হয় বৃষ্টির দাগ।

কে যেন বলেছিল, মাটির ঘর তো সোনার ঘর
সোনার তাল গলে পড়ছে বহুদিন,
মাহাতান অপেক্ষা করে অতিথির 
সারা ঘরে আগুন জ্বালিয়ে।


৩০/১/২১