প্রাকৃতিক সম্পদে পুরুলিয়া

কল্পোত্তম


প্রাকৃতিক সম্পদ বলতে কেবলমাত্র কোনো স্থানের ভূ-অভ্যন্তরস্থ খনিজ সম্পদকেই বোঝায় না। এর বাইরেও প্রকৃতিতে নানা রকম প্রাকৃতিক সম্পদ ছড়িয়ে রয়েছে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যাদের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই যে সকল স্থানে খনিজ সম্পদের চিহ্নমাত্রও নেই সেইসব স্থানও প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধশালী থাকবে না এমনটা নিশ্চয়ই করে বলা সম্ভব না। তারপর রত্নগর্ভা ছোটনাগপুর মালভূমি অঞ্চলে অবস্থিত আমাদের পুরুলিয়া তো খনিজ সম্পদের এক পরিপূর্ণ ভান্ডার। অর্থাৎ গর্ব করে বলা যেতেই পারে-----
                      "পুরুলিয়া রূপে গুণে সতী। 
                       পাঁজরে পাঁজরে তার হীরা
                       পাঁজরে পাঁজরে গাঁথা মোতি।"
              
              পুরুলিয়ার প্রাকৃতিক সম্পদ সম্পর্কে বলতে গেলে প্রথমেই একে দু'ভাগে বিভক্ত করে নেওয়া ভালো। বনজ সম্পদ এবং খনিজ সম্পদ। তারপর একে একে আলোচনা করা হলে বোঝার ক্ষেত্রে অনেকটাই সহজ হয়।
              মানব সভ্যতার ইতিহাসকে পাথর, তামা, ব্রোঞ্জ এবং লোহার বিভিন্ন যুগে বিভক্ত করা হয়েছে। এর থেকেই প্রতীয়মান হয়ে ওঠে মানব সভ্যতার বিকাশের ক্ষেত্রে এইসব ধাতু বা খনিজের গুরুত্ব কতখানি।
                শিলা থেকে প্রাপ্ত প্রাকৃতিক সম্পদ বা খনিজ  দিন প্রতিদিন হারিয়ে যাচ্ছে। সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে এইসব খনিজের চাহিদা বাড়লেও তাদের পুনরুৎপাদন না হওয়ায়, অর্থাৎ ভূ-গর্ভে সীমিত পরিমাণ খনিজ সম্পদ থাকায় টান পড়ছে জোগানে। তাই, নিত্য নতুন জায়গাতে অনুসন্ধান চলছে খনিজের। আহরণ খরচের তুলনায় লাভজনক মনে হলেই তুলে নেওয়া হচ্ছে খনিজ।
              বেসাল্ট এবং গ্রানাইটের মতো কিছু শিলা রাস্তা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়, সেইজন্য তাদের অর্থনৈতিক মূল্যও তুলনা মূলক কম। লোহা, তামা এবং সোনার মতো অন্যান্য যে সকল খনিজ, যেগুলোর নির্দিষ্ট ব্যবহার রয়েছে এবং সরবরাহও সীমিত, তাদের মূল্যও বেশি। 
               মানব সভ্যতার গোড়ার দিকে খুব বেশি খনিজের সঙ্গে আমাদের পরিচিতি ঘটেনি। তারপর সভ্যতার চাকা যত গড়িয়েছে ততোই পরিচিতির ব্যাপ্তিটা ক্রমাগত বেড়েছে। বর্তমান শিল্প-যুগে একটার পর একটা নতুন খনিজ আবিষ্কৃত হতে হতে অত্যাধুনিক শিল্পে খনিজের ব্যবহার বেড়েছে প্রচুর। 
                পুরুলিয়া হল পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে পশ্চিমের জেলা, যেখানে বিভিন্ন যুগ-সময়ের ভূতাত্ত্বিক গঠন এবং ছোটনাগপুর মালভূমির মতো বৈচিত্র্যময় ভূদৃশ্য রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, এই জেলাটি রাঁচি ভূ ও শিলা-গাঠনিক পৃষ্ঠের পূর্বের ধারাবাহিক অংশ। তাই, এই অংশটি ছোটনাগপুর মালভূমির সমস্ত ভৌত বৈশিষ্ট্য বহন করে। আর ঋদ্ধ খনিজ সম্পদের দিক থেকে পুরুলিয়া পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য জেলাগুলির মধ্যে প্রথম স্থানে রয়েছে।
               এই অঞ্চলে যে সকল খনিজ পদার্থ পাওয়া যায় তাদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হল চীনামাটি, কয়লা, তামা। এছাড়া ফেল্ডস্পার, ফ্লুরাইট, হলদে ঢালাই-বালি, চুনাপাথর, রাস্তার উপকরণ এবং কোয়ার্টজ হলো অন্যান্য খনিজ যেগুলো এই জেলায় পাওয়া যায়। বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে তুলনামূলকভাবে যে খনিজগুলো অপর্যাপ্ত সেগুলি হল অ্যাসবেস্টস, বুরাইট, ক্যালসাইট, ফায়ার ক্লে, গারনেট, গ্রাফাইট, লিমোনাইট, পাইরাইট, রুটাইল, কায়ানাইট, ম্যাগনেটাইট, মাইকা, বিল্ডিং উপাদান, লৌহ-আকরিক এবং কয়েকটি তেজস্ক্রিয় খনিজ। 
                পুরুলিয়া জেলার মোট আয়তন ৬২৫৯ বর্গ কিলোমিটার। এই জেলার উত্তর, পশ্চিম এবং দক্ষিণ দিকটি ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্য এবং পূর্ব দিকটি পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া ও মেদিনীপুর জেলা দ্বারা বেষ্টিত। 
               এই অঞ্চলের জমির উপরিভাগের গঠন বিবর্তনের বিবর্তন দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়, অবক্ষয়, অবনমন, উত্থান ইত্যাদি দ্বারা নির্ধারিত হয়েছে। ফলস্বরূপ সমগ্র এলাকাটিকে মহা-বৈষম্য, উত্তরাধিকারের ভূমি দ্বারা চিহ্নিতকরণ করা হয়েছে। মালভূমি, পাহাড়, উপত্যকা, খাড়া পাড়, শৈলশিরা ইত্যাদি হল এই অঞ্চলের প্রাচীনতম ভূতাত্ত্বিক গঠন। সাধারণত গন্ডোয়ানা এবং আর্কিয়ান শিলা এই এলাকায় পাওয়া যায়। পুরুলিয়া জেলা অঞ্চলটি পূর্বে একটি ঘূর্ণায়মান উচ্চভূমি নিয়ে গঠিত যা একটি রুক্ষ উচ্চভূমিতে পরিবর্তিত হয় এবং পশ্চিমে বিচ্ছিন্ন টপোগ্রাফি। সাধারণ ঢাল দক্ষিণ থেকে উত্তরে উচ্চতার সাথে বৃদ্ধি পায়।
               পুরুলিয়া জেলা মধ্য ভারতের পাহাড় এবং ছোটনাগপুর মালভূমি থেকে পশ্চিমবঙ্গের দামোদর সমভূমি পর্যন্ত বিস্তৃতির শেষ দুটি ধাপ গঠন করে।  জেলার বাকি অংশে মাঝে মাঝে শক্ত পাথরের টিলা সহ একটি মৃদু অস্বস্তিকর ভূ-সংস্থান রয়েছে, যেমন পাঞ্চেত পাহাড়।   
               এই সুবিস্তৃত অঞ্চলের কোথায় কোন্ খনিজ বর্তমান তার এটটা সংক্ষিপ্ত বিবরণ নীচে দেওয়া হল।


চায়না ক্লে বা চীনামাটি:

চীনা মাটির দিক থেকে পুরুলিয়া জেলা শীর্ষস্থানীয়। এখানে দুই ধরনের চীনামাটি পাওয়া যায়, একটি গ্রানাইটের সাথে যুক্ত এবং অন্যটি ফাইলাইটের সাথে যুক্ত। গ্রানাইটের সাথে যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ চীনামাটির সঞ্চয়  রামকানালী রেলস্টেশনের কাছে ধাতারাতে, আদ্রা থেকে প্রায় ১৯ কিলোমিটার দূরে কালাঝোর ও কলাবনীতে এবং মানবাজার থেকে প্রায় ০৮ কি.মি. দূরে মাহাতমারাতে রয়েছে। এছাড়া শিয়ালডাঙ্গা, দান্দুডি এবং তামাখুনে চীনামাটির একটি সাদা পাউডারের মতো মিশ্রণ পাওয়া যায় যা গ্রানাইট শিলায় ফেলসপ্যাথিক উপাদানগুলির পচন থেকে উদ্ভূত হয়। এটি ব্লিচিং উপাদান, টেক্সটাইল শিল্প, কাগজ শিল্প, ইনসুলেটর কারখানা প্রভৃতির জন্য ব্যবহৃত হয়। ধাতারায় মজুত রয়েছে আনুমানিক ৮.২ লক্ষ টন, খড়িদুয়ারায় ৫৪ হাজার টন এবং শিয়ালডাঙ্গায় ১.৩ লক্ষ টন। কলাবনীতে মৃৎপাত্রের উপযোগী চীনমাটি ব্যতীত অন্য সবগুলি কেবল কাগজ, টেক্সটাইল, রাবার শিল্প এবং কীটনাশক তৈরির জন্য ফিলার হিসাবে উপযুক্ত।


ফায়ার ক্লে বা তাপসহ মাটি:

ফায়ার ক্লে বা তাপসহ মাটির গুরুত্বপূর্ণ সঞ্চয় প্রধানত পুরুলিয়ার রানীগাং কয়লা ক্ষেত্রের মধ্যে রয়েছে যা পাঞ্চেত পাহাড়ের হারমিটস হাট এবং রানিমহলে অবস্থিত। তাছাড়া মূল কয়লা বেল্টের বাইরে আরও দক্ষিণে চাকলতাবাড়িতে রাজাবাসায় একটি সঞ্চয় রয়েছে। এখানে ফায়ার ক্লে বা তাপসহ মাটি অবশিষ্ট কাদামাটির পাললিক, ধূসর, নীল বা কালো রঙের এবং প্রধানত এই মাটির সঙ্গে কয়লা একটা বিশেষ পরিমাপের সাথে যুক্ত রয়েছে।


কয়লা:

খনিজ সম্পদ উত্তোলনের দিক থেকে এখনও পর্যন্ত কয়লা পুরুলিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। আনুমানিক ৪৩ মিলিয়ন টন উচ্চ গ্রেড এবং ১১ মিলিয়ন টন নিম্ন গ্রেডের কয়লা এখানে বিদ্যমান। এই জেলার চালু কোলিয়ারিগুলো সবই নেতুরিয়া থানায় অবস্থিত। এছাড়া দামোদর অববাহিকার দক্ষিণে অবস্থিত রানিগাং কয়লা ক্ষেত্রটি উচ্চ মানের কয়লার পাশাপাশি উৎপাদনের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকায় রয়েছে। এই জেলাতেই দেশের ১৮% কয়লা মজুদ রয়েছে এবং এখানে মজুত কয়লার বেশিরভাগটাই উন্নত মানের কয়লা।


তামা:

সম্প্রতি মানবাজার থানার অন্তর্গত তামাখুনে একটি ৬ মিটার গভীর প্রাচীন তামার খনি আবিষ্কৃত হয়েছে। সেখানে আনুমানিক তামার মজুদ ৮০০০ টন। এই তামা-সঞ্চয় বেল্টটি সিংভূম তামার খনির উত্তরের ধারাবাহিক বেল্ট।


ফেল্ডস্পার:

ফেল্ডস্পার এই জেলার অনেক জায়গাতেই পাওয়া যায়। এটি একটি গ্লাস হোয়াইটনার হিসাবে ব্যবহৃত হয়। সাধারণত সঞ্চয়গুলি থেকে সংগ্ৰহ করে কলকাতায় পাঠানো হয়। যেখানে ব্যবহারের আগে পিণ্ডগুলিকে সূক্ষ্মভাবে গুঁড়ো করা হয়ে থাকে।


ফ্লুরাইট:

ইস্পাত, এনামেল এবং রাসায়নিক শিল্পের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং অনিবার্য উপাদান। তাছাড়া এটি একটি বিরল খনিজ তাই এটি শিল্পের ক্ষেত্রে এতখানি তাৎপর্যপূর্ণ। পুরুলিয়া জেলার ঝালদা থানার বেলামু পাহাড়ে এই খনিজ পাওয়া যায়।


চুনাপাথর:

পুরুলিয়া জেলার বিভিন্ন স্থানে চুনপাথর পাওয়া যায়। কোটশিলা থানা অঞ্চলে প্রায় ২০ মিলিয়ন টন চুনাপাথরের মজুদ রয়েছে, বিশেষ করে জাবর এবং ইছাহাতু গ্রামে। স্থানীয় লোকজন এখানকার চুনাপাথরের খনিগুলোতে কাজ করে থাকেন। ঝালদা অঞ্চলের চুনাপাথর মূলত সিমেন্ট শিল্পে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।


মোল্ডিং বালি:

দামোদরের দক্ষিণাঞ্চলে বরাকর গঠন এবং পাঞ্চেত গোষ্ঠীর শিলাগুলির সাথে যুক্ত জেলার বেশ কয়েকটি স্থানে ছাঁচনির্মাণ বালি বা মোল্ডিং বালি পাওয়া যায়। গিরফালা, সাসপুর, সৌরি, জগন্নাথডি, বাগুলিয়া, দুমদুমি, বালতোড়া, চৌরাশি এবং রামপুরে ভাল মানের ছাঁচ তৈরি করা বালি পাওয়া যায়। মধুকুন্ডা রেল স্টেশনের কাছে বেশ কয়েকটি খনি রয়েছে যেগুলো থেকে উত্তোলন চলছে।


লৌহ আকরিক:

পাঞ্চেত পাহাড়, ঝালদা, গৌরাঙ্গডি, সুপুর এবং মানবাজারে লৌহ-আকরিকের ছোটো ছোটো মজুত রয়েছে। এর বেশিরভাগটাই পেগম্যাটিসের সাথে যুক্ত। অন্যদিকে কোয়ার্টজ বলয়গুলিতে লিমোনাইট, ম্যাগনেটাইট এবং রুটাইল রয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।


মাইকা বা অভ্র

বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতিতে বিদ্যুৎ নিরোধক হিসেবে ব্যবহৃত খনিজ পদার্থ মাইকা বা অভ্র এই জেলার বিভিন্ন স্থানে পাওয়া যায়। এবং তাদের গুণমানও আলাদা।  বরাভূমের উত্তরাঞ্চলে রুবি মাইকার ছোটো ছোটো সঞ্চয় পাওয়া যায়। কাশিপুর থানার দ্বারকেশ্বর নদীর অববাহিকায় মাস্কোভাইট বা সাদা মাইকার অনুরূপ ছোটো ছোটো সঞ্চয় রয়েছে। এছাড়া বলরামপুর থানা এবং বান্দোয়ান থানার বিভিন্ন জায়গাতে অভ্রের প্রচুর মজুত রয়েছে। 


তেজস্ক্রিয় খনিজ পদার্থ:

ইউরেনিয়ামের মতো বহু মূল্যবান তেজস্ক্রিয় খনিজের  উপস্থিতি পুরুলিয়া জেলার গুরুত্ব দ্বিগুণ করে তুলেছে। পুরুলিয়া, বাঁকুড়া ও মেদনীপুর জেলার ত্রি-সংযোগ স্থল কুইলিপালে এই খনিজ সম্পদের মজুত রয়েছে। যা বর্তমান সময়ে বহু গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই খনিজের পরিমাণ খুব একটা বেশি নেই। অর্থাৎ বানিজ্যিকভাবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে অপ্রতুল।


স্বর্ণ:

জেলার প্রায় সব নদীতেই সোনা পাওয়া যায়। তবে কাঁসাইয়ের দুটি উপনদী টোটকো ও কুমারীকে সোনার সবচেয়ে উৎপাদনশীল স্রোত বলা হয়। এছাড়া বেলডিতেও অল্প পরিমাণ সোনা রয়েছে গ্যালেনার সাথে।


কায়ানাইট এবং গ্রাফাইট:

কায়ানাইট এবং গ্রাফাইট উভয়ই কালাঝোর, কাহিপুর, গৌরাঙ্গডি, বনগোড়া, ডিমডিহা ও জেলার পাঞ্চেত পাহাড় এলাকাতে পাওয়া যায়। কায়ানাইট, সিলিমানাইট এবং গারনেট পুরুলিয়া জেলার পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত অঞ্চল বরাবর অনেক জায়গাতে পাওয়া যায়। 
                উপরে উল্লিখিত খনিজগুলি ছাড়াও, জেলার বিভিন্ন জায়গাতে আরও বেশ কিছু খনিজ সম্পদ পাওয়া যায়; তবে সেগুলির অর্থনৈতিক গুরুত্ব খুব কম, সেগুলি এই জেলার অর্থনীতির উপর খুব একটা প্রভাব ফেলার অবস্থায় নেই। সেগুলি হল খনিজ সার, সিলিকা, রক, ম্যাঙ্গানিজ, প্লাটিনাম, টাইটানিয়াম আকরিক, বিল্ডিং স্টোন, রাস্তার ধাতু ইত্যাদি। 
                উল্লিখিত সমস্ত খনিজগুলির প্রাপ্যতা সত্ত্বেও, এই জেলা অর্থনৈতিক দিক থেকে এখনও দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। এবং এখনও জেলার অনেকানেক অঞ্চল বনজ সম্পদের উপর অনেকাংশেই নির্ভরশীল। এর প্রধান কারণ এখানে পাওয়া খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে সরকারের উদাসীনতা এবং যে সকল খনিজ সম্পদ এখানে উত্তোলন করা হয় সেই খনিজ সম্পদ সম্পর্কিত শিল্প কারখানাগুলির দূরবর্তী জেলা বা রাজ্যে অবস্থান।
               উল্লিখিত খনিজগুলির অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য যথাযথ ও বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা গ্ৰহণ অবশ্য প্রয়োজন। স্থানীয় দক্ষ শ্রমিকদের কাজে লাগিয়ে খনিজ সম্পদ উত্তোলন করানোর ব্যবস্থা গ্ৰহণের সাথে সাথে সরকার এই এলাকাতেই কিছু উৎপাদন শিল্প স্থাপন করলে পুরুলিয়ার মানুষ রোজগারের সুযোগ পাবে এবং তাদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটার সম্ভাবনা বাড়বে। 
               এরপর আসি বনজ সম্পদের কথায়। খনিজ সম্পদের মতোই পুরুলিয়া জেলা বনজ সম্পদের দিক থেকেও খুবই সমৃদ্ধশালী একটা জেলা। এই জেলার বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন রকম বনজ সম্পদের উপস্থিতি; এখানকার মানুষের জীবনযাত্রাকে অনেকাংশেই সাবলীল করে তুলতে সাহায্য করে আসছে আদি অনন্তকাল থেকে। তাই এখানকার অর্থনৈতিক দিক থেকে বনজ সম্পদের গুরুত্ব কোনো অংশেই কম নয়। যেসকল বনজ সম্পদ এখানকার অর্থনৈতিক চাকাকে সচল করে রাখতে সাহায্য করে আসছে সেই সব বনজ সম্পদের বিষয়ে একে একে আলোচনা করা হলো এখানে।


পাতা:

পুরুলিয়া জেলার বিভিন্ন বনাঞ্চলে, এমনকি লোকালয়েও বিভিন্ন রকম গাছের পাতা পাওয়া যায়। যে সকল পাতা এই জেলার মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সাবলীল করে তোলার ক্ষেত্রে যথেষ্ট ভূমিকা গ্রহণ করে । যার মধ্যে অন্যতম শাল পাতা, পলাশ পাতা এবং কেন্দু পাতা। অযোধ্যা পাহাড় সংলগ্ন লোকালয়গুলির আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষেরা কচি শাল পাতা সংগ্রহ করে নিকটবর্তী শহরগুলিতে বিক্রি করে থাকেন। কখনো সরাসরি পাতা বিক্রি করেন এবং কখনও তা থেকে বিভিন্ন দ্রব্য তৈরি করে বিক্রি করেন। যেমন খাবার খাওয়ার পাতা ( বিভিন্ন হোটেল ও বিয়ে বাড়িতে খাবার খাওয়ার কাজে ব্যবহৃত হয় ) ও খালা ( ঠোঙ্গা )। এছাড়া নিজস্ব প্রয়োজনে এই কাজে অনেকেই ব্যবহার করে থাকেন পলাশ পাতাও। বিশেষ করে যে অঞ্চলগুলিতে শালপাতার প্রাচুর্য্যতা নেই। তবে এই পাতা ব্যবসায়িক ভাবে ব্যবহৃত হয় না। অন্যদিকে কেন্দু পাতা বিড়ি তৈরির কাজে ব্যবহৃত হয় বলে এই পাতার চাহিদা রয়েছে ব্যাপক হারে। এই পাতা পশ্চিমবঙ্গ ছাড়িয়ে অন্যান্য রাজ্যের বাজারেও রপ্তানি করা হয়ে থাকে।
               পুরুলিয়া জেলার যেসব গ্রামে জ্বালানি কাঠের প্রাচুর্য্যতা নেই, সেখানে বিভিন্ন গাছের শুকনো পাতা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তাই অনেকানেক গ্রামের মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে শুকনো পাতা সংগ্রহ করে নিয়ে আসেন নানাভাবে।


কাঠ:

শাল, সেগুন, কুসুম, বাবলা, শিরীষ, অর্জুন, শিশু, গামার, ডকা, অশ্বত্থ, নিম, আম, জাম, বহড়া প্রভৃতি যে সকল উচ্চ-গুণমানের কাঠযুক্ত বৃক্ষ রয়েছে, তাদের কাঠ আসবাবপত্র নির্মাণের কাজে ব্যবহার করা হয়। তাই অর্থনৈতিক দিক থেকে এইসব বৃক্ষের কাঠ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে পলাশ, করঞ্জা, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, বট, কাঁটা শিরীষ, সোনাল, দুধুঘাঁটু, কুল, প্রভৃতি গাছের কাঠ সাধারণত জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তাই যে সকল জমিতে চাষাবাদ হয় না সেইসব জমিতে বিভিন্ন ধরনের বৃক্ষ রোপণ করে থাকেন এইসব এলাকার মানুষ। এছাড়াও এই অঞ্চলের আরো একটি অর্থনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ গাছ হলো বাঁশ গাছ। কাঁচা বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে বাঁশ গাছের গুরুত্ব অপরিসীম।


ছত্রাক:

পুরুলিয়ার জঙ্গলাঞ্চলে এবং মাঠে-ঘাটে সারা বর্ষাকাল ও বর্ষা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রকম সুমিষ্ট এবং পুষ্টিকর ছত্রাক পাওয়া যায়। যাদের স্থানীয় ভাষায় 'ছাতি' বলে। এইসব ছত্রাকের চাহিদা ব্যাপক। তবে ছত্রাক বেশিক্ষণ রাখা যায় না বলে এগুলো বাইরে রপ্তানি করা সম্ভব হয় না। তাদের সুমিষ্টতার তারতম্য অনুযায়ী স্থানীয় বাজারগুলোতে চাহিদার তারতম্য পরিলক্ষিত হয়। সেই হিসেবেই নির্ধারিত হয়ে থাকে মূল্যও। মুচি ছাতি, বালি ছাতি বা ফুড়কি ছাতি, তুমা ছাতি, টিলা ছাতি ( উই ঢিবিতে বার হয় ) প্রভৃতি ছত্রাক খানিকটা কম দরে বিক্রি হয়। তবে কাড়ানি ছাতি, পুঁয়াল ছাতি ( বৃষ্টির জলে পচে যাওয়া খড়ের গাদা থেকে প্রাকৃতিকভাবে জন্মায় ) প্রভৃতি ছত্রাকের ব্যাপক চাহিদা থাকায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এগুলো উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়ে থাকে।


মধু:

জেলার পাহাড় এবং বনাঞ্চলগুলিতে উচ্চগুণ সম্পন্ন মহৌষধি মধুর প্রাচুর্য্যতা এখানকার মানুষের জীবনধারাকে অনেক বেশি সহজ করে তুলেছে। বাচ্চাদের স্বাস্থ্য বর্ধন থেকে শুরু করে বড়োদের অনেকানেক রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে মধু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে । 


তেল:

জাড়া ( রেড়ি ), কচড়া ( মহুয়া গাছের ফল ), নিম, করঞ্জা, কুসুম প্রভৃতি তেল এখানকার বনাঞ্চল এবং তার পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষের তেলের চাহিদা মিটিয়ে থাকে।  
                কচড়া ও কুসুম তেল ভোজ্য তেল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে নিম, রেড়ি ও করঞ্জা তেল  ব্যথা বেদনা ও খোস-পাচড়ার ঔষধি হিসেবে এবং স্নানের সময় মাখার ( মর্দন ) কাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।


পশুপাখি:

প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে পশুপাখির গুরুত্ব অপরিসীম। সেই দায়িত্ব রক্ষার কাজে যারা সর্বদা নিয়োজিত, তারাও এই জেলার সম্পদ হিসেবে বিবেচিত।
             এক জায়গার বীজ অন্য জায়গায় নিয়ে গিয়ে বন-জঙ্গল বিস্তারের ক্ষেত্রে পাখিরা এক বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। সেইসব নানা রকম প্রজাতির পাখির উপস্থিতি এই অঞ্চলকে সমৃদ্ধশালী করে তুলেছে। যারা গাছের বংশবৃদ্ধি ঘটিয়ে এখানকার মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতিতে দারুণভাবে সহায়তা করে আসছে। তাছাড়া খরগোশ, ভাম, বেজি, বুনো শুকর, বুনো বিড়াল, হরিণ প্রভৃতি পশুরা বনাঞ্চলের মানুষের মাংসের চাহিদা পূরণ করে থাকে।


ঔষধি:

মানভূম এলাকার প্রায় সমস্ত জায়গাতে ঔষধি গাছ গাছড়ার উপস্থিতি এখানকার মানুষের জীবনযাত্রাকে সাবলীল করে তুলতে অনেকটাই সহায়ক হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে যে সকল পরিবারগুলো অর্থনৈতিক দিক থেকে অসচ্ছল, অসুখ-বিসুখের সময় ডাক্তার দেখাতে বা ঔষধ কিনতে অসমর্থ; তাঁরা এইসব ঔষধি গাছ-গাছড়া, লতাপাতা দিয়েই নিজেদের চিকিৎসা করে থাকেন। বলতে গেলে তাঁদের অসচ্ছল জীবনধারাকে সাবলীলভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে এখানকার সুলভ ঔষধি গাছ-গাছড়ারাই।


পশুখাদ্য ঘাস:

কৃষি কর্মের জন্য বাড়িতে পশুপালন অবশ্য প্রয়োজন। তাছাড়া অর্থনৈতিক দিক থেকে চরম সংকটের সময় অর্থের যোগানের জন্যও পশুপালনের প্রয়োজন হয়ে থাকে। যেসব পশু বিক্রি করে সেই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন মানুষ। কিন্তু সেই পশুপালন করার জন্য যে তৃণের প্রয়োজন, পুরুলিয়ার তৃণভূমিগুলিতে তার প্রাচুর্য্যতা থাকায় অতি সহজেই পশু পালন করে উঠতে পারেন এখানকার মানুষ। শুধু তাই নয়, ছোটো ছোটো শহরের কাছে অবস্থিত গ্রামাঞ্চলের মানুষেরা অনেক সময় পশুখাদ্য বিভিন্ন রকম পাতা এবং ঘাস সেই শহরে বিক্রি করে থাকেন অর্থের বিনিময়ে। সংসারকে সচল রাখার এও এক উপায় এইসব অঞ্চলের মানুষের। তাই এখানে অবস্থিত তৃণভূমির গুরুত্বকে কোনো অংশেই কম বলা যায় না।
              পুরুলিয়া ছোটনাগপুর মালভূমির একটি অংশ বিশেষ হওয়ায় এই এলাকাতে মাঝে মাঝেই পাহাড়, টিলা এবং বনাঞ্চলের অবস্থান বিদ্যমান। ফলে কাঠ, পাতা, ফল-মূল প্রভৃতি বনজ সম্পদের অভাব নেই। কিন্তু এখানকার মাটি অনুর্বর এবং ভূপৃষ্ঠে অবস্থানরত মাটির জলধারণ ক্ষমতা অত্যন্ত কম। এই কারণে এখানে কৃষির বিকাশ সম্ভব হয়নি। তাই সর্বাধিক মানুষ বনজ সম্পদ সংগ্রহে নিয়োজিত এবং কিছু সংখ্যক লোক তাঁদের পেশা ও কর্মসংস্থানের জন্য প্রতিবেশী জেলা ও প্রতিবেশী রাজ্যে চলে যান। অর্থাৎ পায়ের তলায় মূল্যবান খনিজ সম্পদ থাকা সত্ত্বেও এই জেলার উন্নয়ন হয়নি। বলরামপুর, বাগমুন্ডি, ঝালদা, আড়ষা, বান্দ্যোয়ান, বরাবাজার প্রভৃতি থানাগুলোর বহু অঞ্চলের মানুষের বাঁচার একমাত্র সংস্থান বনজ সম্পদ। এই অঞ্চলগুলির সাপ্তাহিক হাট এবং স্থানীয় বাজারগুলোতে চোখ রাখলেই দেখা যায় কেউ বিক্রি করছেন জ্বালানি কাঠ বা কাঠের তৈরি বিভিন্ন জিনিসপত্র, আবার কেউ বিক্রি করছেন কেঁদ, পিয়াল, ভেলা প্রভৃতি ফল, বিভিন্ন ঔষধি মূল, পাতা ইত্যাদি।



কল্পোত্তম/১২/৪/২২