শিকার উৎসব, একটা পরম্পরাগত আদিবাসী রীতি

কল্পোত্তম



ভারতীয় মহাকাব্য মহাভারতের এক চরিত্র শকুন্তলা। শকুন্তলা ছিলেন হিন্দু পুরাণে বর্ণিত রাজা দুষ্মন্তের স্ত্রী এবং সম্রাট ভরতের মা। কালিদাস তাঁর অভিজ্ঞানশকুন্তলম্ নাটকে রাজা দুষ্মন্তের মৃগয়ায় যাওয়ার ঘটনা সুচারুরূপে বর্ণনা করেছেন। মৃগয়ায় গিয়ে হরিণকে তাড়া করতে করতে মহর্ষি কন্বের তপোবনে প্রবেশ করেন তিনি এবং সেখানেই সাক্ষাৎ হয় শকুন্তলার সঙ্গে। তারপর দু'জন দু'জনের প্রেমে পড়লে মহর্ষির অজ্ঞাতে গান্ধর্ব মতে বিবাহ সম্পন্ন হয় তাঁদের।
            অর্থাৎ মৃগয়া বা শিকার বিষয়টা যে নতুন কিছু তা কিন্তু নয়। প্রাচীনকাল থেকেই এর একটা ধারা প্রবাহ রয়েছে। যে ধারা প্রবাহ সময়ের সাথে পৃথিবীর পরিবেশ পরিবর্তনের কারণে পরিবর্তিত হয়ে অনেকটাই ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে বর্তমান সময়ে এসে প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলার মুখে।
             তাছাড়া আদিম মানুষ যখন বনে জঙ্গলে বাস করতেন তখন পশু শিকার ছিল তাদের একটা পেশা বা জীবনধারণের অঙ্গ। এবং আদিম জনজাতি সেই পেশার ধারক ও বাহক এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। তাই জল-জঙ্গলের একচ্ছত্র অধিকারী আদিবাসী জনমানবের মধ্যে এখনো সেই প্রবণতা বিদ্যমান। কিন্তু শিকারকে কেন্দ্র করে একটা নির্দিষ্ট দিনে উৎসব পালন হয়ে থাকে, এখানেই নতুনত্ব।
              বৈশাখী পূর্ণিমা যা পরবর্তীকালে গৌতম বুদ্ধের জন্মের পর বুদ্ধ পূর্ণিমা হিসেবে নির্দিষ্ট হয়ে যায়, এই বিশেষ দিনটিতে অনাদিকাল থেকে শিকার উৎসব পালিত হয়ে আসছে আদিবাসী অধ্যুষিত অযোধ্যা পাহাড়ে। কেবলমাত্র পশ্চিমবঙ্গের আদিবাসীরাই এই উৎসবে যোগদান করেন তেমনটাও নয়। পার্শ্ববর্তী রাজ্য ঝাড়খন্ড, আসাম এবং উড়িষ্যা থেকেও বহু আদিবাসী মূলবাসী মানুষ শিকার উৎসবে এসে শামিল হন। ধামসা মাদল প্রভৃতি বাজবাদ্য সহকারে নাচ খেলের মধ্যে দিয়ে পালিত হয় শিকার উৎসব।
              শুরু থেকেই এই উৎসবে পশুনিধন করা হয়েছে। এমন কি সে সময় এই জঙ্গলেও ভয়ানক পশুদের বাসস্থান ছিল বলে শিকার উৎসবে যাওয়ার আগে নিজের নিজের স্ত্রীর শাঁখা চুড়ি বা লোহা (লোহার তৈরি কামার পেটা একটি চুড়ি যা বিয়ের সময় পরিয়ে দেওয়া হয় স্ত্রীকে এবং তা আমৃত্যু পরে থাকতে হয়। কেবলমাত্র স্বামী মারা গেলে খুলে দেওয়া হয়। তখন সেই চুড়ি পরার অধিকার হারিয়ে ফেলেন স্ত্রী।) খুলে দিতেন শিকারীরা। কারণ সেখান থেকে ফিরবেন কি না তার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। হয়তো মৃত্যুও হতে পারে হিংস্র পশুর আক্রমণে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে হিংস্র জানোয়ারের পরিমাণ কমে যাওয়ায় এই প্রথা বর্তমান সময়ে এসে তার গুরুত্ব হারিয়েছে। আবার অনেকে পিতলের কলসিতে জল ভরে শালগাছের দু'টি কচি ডাল সোজাভাবে ডুবিয়ে রাখতেন অর্ধ নিমজ্জিত অবস্থায়। ভোরবেলায় ডালগুলির রঙ দেখতেন এবং আসন্ন শিকার সম্বন্ধে অনুমান করতেন। অর্থাৎ শিকার পাওয়া যাবে কি না।
               পুরুষেরা শিকারে বেরিয়ে বাড়ি ফিরে না আসা পর্যন্ত মহিলারা কোনো রকম প্রসাধন করতেন না। শিকারে কোনো রকম বিপদ হলে তিনবার ঘণ্টা বাজানো হয়। সেই ঘন্টাধ্বনি শুনে অন্যান্য শিকারীরা সেখানে গিয়ে উপস্থিত হন। এবং বিপদগ্রস্থ শিকারীকে উদ্ধার করার চেষ্টা করেন।
               স্থানীয় শিকারীদের দল অযোধ্যা পাহাড়ের চারপাশ থেকে উঠলেও বাইরে থেকে আসা শিকারীদের দল ট্রেন থেকে উরমা স্টেশনে নেমে ঘাটবেড়ার পথ ধরে পাহাড়ে উঠে পড়েন। বৈশাখী পূর্ণিমার আগের দিন সন্ধ্যায় সমতলে খাবার খেয়ে এবং পরের দিন সকালের জন্য শুকনো খাবার গামছায় বেঁধে নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েন তাঁরা। চলতে চলতে পৌঁছে যান কালি ঝর্নার কাছের মাঠে। সেখানেই আশ্রয় গ্ৰহণ করেন সে রাতে। পরের দিন সকালে অর্থাৎ বুদ্ধ পূর্ণিমার দিন সকালে খাওয়া দাওয়া সেরে শিকার করতে করতে পাঁতা ধরে (যাকে সেনাবাহিনীর ভাষায় চিরুনি তল্লাশি বলে) এগোতে থাকেন। সেদিন দুপুরের মধ্যে গড়ে (পাহাড়ের মাথায়) গিয়ে পৌঁছান। এটা সীতা চাটান নামেই বিশেষ পরিচিত। এখানেই মাটির হাঁড়ি কিনে বাড়ি থেকে আনা চাল দিয়ে ভাত রান্না করেন। রান্না করেন শিকার করা পশুপাখির মাংস। চিতা, হরিণ, খরগোশ, বনবরা, সাহি, ময়ূর, তিতির, ডাহুক ইত্যাদি তাদের মধ্যে অন্যতম।
               শিকারে জন্তু বা পাখি মারা গেলে তার ভাগ বাটোয়ারার নির্দিষ্ট বিধি রয়েছে। শিকার নিয়ে অমীমাংসিত বিরোধের নিষ্পত্তি মেটাতে ফুলহি ঢুড়ুপ বা বিচারসভা বসে।
               সীতা চাটানের কাছেই রানিবন। হিন্দু লোকায়ত অনুসারে, রাম ও সীতা বনবাসে থাকার সময় এক দিনের জন্য অযোধ্যা পাহাড়ে এসেছিলেন। এসে এই বনে রাত কাটিয়েছিলেন। সেই থেকেই এই বন রানিবনের শিরোপা পায়। এই বনের পুরোনো শাল গাছের পাতায় সীতার চুল পাওয়া যেত। আমার বাবা কিশোর বয়স থেকে যৌবন বয়স পর্যন্ত গ্ৰামের বয়স্কদের সঙ্গে শিকারে গিয়ে সচক্ষে সীতাচুল দেখেছেন এবং শালপাতায় মুড়ে বাড়ি আনার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাড়িতে নিয়ে আসতে পারেননি। শাল পাতার মোড়ক থেকে উধাও হয়ে গিয়েছে। শুধু বাবা কেন, কোনো ব্যক্তিই সীতাচুল বাড়িতে নিয়ে যেতে সফল হননি আজ পর্যন্ত। আর সেটাই সীতাচুলের মাহাত্ম্য।
               এখানে এসে সীতা তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়লে রাম তীরের সাহায্যে মাটি খুঁড়ে জল বের করে আনেন। সেই জায়গাটি সীতাকুণ্ড নামে পরিচিত। এই কুণ্ড প্রখর খরাতেও শুকোয় না। বৈশাখ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে  শিকারীরা এখানে শিকার উৎসবে যোগ দিতে এসে এই কুণ্ড থেকে জলপান করে থাকেন। তার পাশেই আরো একটি প্রাচীন পাতকূঁয়ো। প্রকৃতি নির্মিত। বিশাল বৃক্ষ মারা যাওয়ার পর তার মূলের মাঝখানের অংশ পচে গিয়ে জলাশয় নির্মিত হয়েছে। আর চারপাশের শক্ত কাঠের আবরণ তাকে সুরক্ষিত রেখেছে। যার স্বচ্ছ সলিল ধারা পান করা সৌভাগ্যের।
              গড়ে এসে রান্না করে খাওয়া দাওয়া এবং নাচ গানের মাধ্যমে আমোদ-প্রমোদ করে রাত কাটান শিকারীরা। বুদ্ধ পূর্ণিমার পরের দিন ভোরে চাঁপা ফুল আর সীতাচুল সঙ্গে নিয়ে শিকার করতে করতে পাহাড় থেকে নেমে পড়েন বাড়ির উদ্দেশ্যে। বাড়ি ফেরার পর হলুদ তেল মাখিয়ে পা ধুইয়ে দেন নিজ স্ত্রী বা ছোটো বোন। তারপর চাঁপা ফুল পবিত্র স্থানে রেখে স্ত্রীকে পরিয়ে দেন খুলে দিয়ে যাওয়া চুড়ি শাঁখা ও লোহা।
             মানব বিবর্তনের ধারায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অবস্থান ও তাদের জীবনচর্চার বৈশিষ্ট্য এক উল্লেখযোগ্য বিষয়। পৃথিবীর সব অঞ্চলের মত ভারতেও এর উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। ভারতে অবস্থিত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে কুড়মি ভূমিজ এবং সাঁওতাল অন্যতম। ভূমিজ সম্প্রদায়ের মধ্যে সে রকম কিছু রীতি রেওয়াজ লক্ষ্য করা না গেলেও কুড়মি এবং সাঁওতালদের নিজস্ব রীতি রেওয়াজ রয়েছে। নিজস্ব ভাষাও রয়েছে। সেই রীতি রেওয়াজের মধ্যেই একটা অন্যতম রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে শিকার উৎসব।
              আদিবাসী সমাজের উৎসবের দিন গুলি হিন্দুসমাজের মত পঞ্জিকা নির্ভর নয়। এঁদের প্রধান উৎসব হল ঋতু উৎসব। আদিবাসী সমাজ যেহেতু প্রকৃতি নির্ভর তাই প্রকৃতিই তাদের আরাধ্য দেবী। বিভিন্ন ঋতুতে তাই নানান ভাবে প্রকৃতির আরাধনা করা হয়। আদিবাসীদের উৎসবের মধ্যে বাহা, করম, সোহরাই, দাসাই ইত্যাদি উৎসব রয়েছে। পরবর্তীতে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘শিকার উৎসব’। যার ভূমিকা এবং গুরুত্ব দুটোই অনুপেক্ষণীয়।
            'আদিবাসী রামায়ণ’ এর খোঁজে দক্ষিণবঙ্গের আদিবাসী অধ্যূষিত বিভিন্ন জেলার গ্রামে ঘুরে ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে দেখা যাবে সাধারণ ভাবে আমাদের জনমানসে ‘শিকার-উৎসব’ বলতে যে ছবি ফুটে ওঠে, সেটি কিন্তু শিকার-উৎসবের প্রকৃত ব্যাখ্যা নয়। সত্যি কথা বলতে কি আদিবাসী অধ্যূষিত অঞ্চলের মানুষগুলির মধ্যে শিকার উৎসবই শুধু নয়, রামায়ণের কাহিনি নিয়েও এক অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে আরেক অঞ্চলের মানুষের, মূল রামায়ণের ঘটনার সঙ্গে তাদের নিজস্ব রামায়ণের ব্যখ্যার কিছু কিছু মতান্তর আছে। যদিও এই রামায়ণ তাদের কোন লিখিত রামায়ণ নয়, এটি বংশ পরম্পরায় মুখে মুখে শ্রুত বা বাহিত হয়ে আসা মৌখিক রামায়ণ বা যাকে সাধারণভাবে ওরাল কনসেপ্ট বলা হয়। 
             আদিবাসীদের শিকার-উৎসব সম্বন্ধে অনেকেরই ধারণা এটি একটি আনন্দোৎসব। প্রতি বৎসর বুদ্ধ পূর্ণিমার দিনে পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ে আদিবাসী পুরুষেরা যান শিকারে। আদিবাসী সমাজে এটি একটি অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। একবার অন্তত তাদের এই শিকারে যোগদান করতেই হয়। এমন কি এই অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়,"চাকোলতোড়ের ছাতা আর অযোধ্যার শিকারে যে না গিয়েছে সে এখনও মায়ের গর্ভে আছে।" অর্থাৎ এই শিকার উৎসবের একটা গভীর তত্ত্ব যে রয়েছে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।
             শিকার-উৎসবের সঙ্গে আদিবাসী পুরুষের শৌর্য, বীর্য ও পৌরুষত্ব প্রমাণের একটা বিষয় জড়িয়ে রয়েছে ওতোপ্রতোভাবে।
              এঁরা সকলেই বিশ্বাস করেন রাম আসলে আদিবাসী সমাজের মস্ত বীর। পরে উচ্চ বর্ণের লোকেরা রামকে জোর-দখল করে নিজেদের বীর বলে প্রচার করেছেন। বহু যুগ আগে সমস্ত আদিবাসী সমাজের বীর যুবকেরা জমায়েত হয়েছিলেন এই অযোধ্যা পাহাড়ের মাথায়। তাঁদের হাতে ছিল অস্ত্র-শস্ত্র, কাড়া-নাকাড়া, শিঙ্গা ইত্যাদি। দিকে দিকে ঘোষণ করা হয়েছিল রামের সমর্থনে আদিবাসী যুবকদের অযোধ্যা পাহাড়ের মাথায় একত্রিত হবার জন্য। সেই জমায়েত ছিল তাঁদের বীর রাজা রামের সমর্থনে সীতাকে উদ্ধারের জন্য। তাঁরা সকলেই সেই পাহাড়ে উপস্থিত থেকে রামের সঙ্গে সহমত পোষণ করেছিলেন। অস্ত্র-শস্ত্রের প্রচন্ড শব্দে গভীর অরণ্য থেকে বেরিয়ে এসেছিল জন্তু-জানোয়ারেরা। তাদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য বধ করতে হয়েছিল কিছু জন্তু-জানোয়ার। সেই আদিকাল থেকে অযোধ্যা পাহাড়ের মাথায় শিকার-পর্ব এক প্রতীকে পরিণত হয় যার অর্থ হল রামের প্রতি আনুগত্য এবং সেই দিনটিকে স্মরণ করা। কিন্তু কালের নিয়মে সেদিনের জমায়েত আজ শিকার-উৎসবে পরিণত এবং সেদিনের বাধ্য হয়ে জন্তু-জানোয়ার বধকে আজকের দিনে পশু-হত্যা করে আনন্দোৎসব পালন করা হয়। তবে সেদিনের সেই জমায়েত বা যাত্রার কিছু মূল অনুষ্ঠান এখনও প্রতীক হিসেবে মানা হয়। এখনও তাদের সমাজের বিচার সভা বসে ঐদিন অযোধ্যা পাহাড়ের মাথায় সমগ্র আদিবাসী সমাজের মানুষগুলির সামনে।
             প্রতি বৎসর বৈশাখী পূর্ণিমা বা বুদ্ধ পূর্ণিমার দিনটি হল আদিবাসীদের শিকার-উৎসবের দিন। প্রশ্ন উঠতে পারে, ভগবান বুদ্ধের জন্মদিনে অর্থাৎ বুদ্ধ পুর্ণিমার দিনটি সারা বিশ্বে শান্তি ও অহিংসার দিন বলে চিহ্নিত। সুতরাং ঐ দিনটিই কেন এই শিকার-উৎসবের দিন বলে বিবেচিত? অনেকের মতে আদিবাসীদের জন্ম সকলের আগে, বুদ্ধেরও আগে। তাই তাঁদের নিয়মে ওই দিনটি শিকার-উৎসবের দিন হিসেবে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। তাও আবার বুদ্ধের জন্মেরও বহু আগে। বুদ্ধদেব সেই নির্দিষ্ট দিনে জন্মগ্রহণ করলে আদিবাসী সমাজের কিছু করার নেই। তাছাড়া শিকার-উৎসব মূলত রামের সমর্থনে আদিবাসী বীর যুবকদের জমায়েত। দিনটি সেই হিসাবেই ঐদিন পালিত, হিংসার জন্য নয়। যদিও কতদিন আগে বা কোন্ সময় থেকে তাঁরা এই উৎসব পালন করছেন তার কোনো লিখিত প্রমাণ নেই। আবার অনেকেই মনে করেন, আনুমানিক ৫৬৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বুদ্ধের জন্মের পর যখন বৌদ্ধ ধর্ম প্রবর্তন হয়। তখন বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তার শুরু হয় ছোটনাগপুর এলাকাতেও। সেই ধর্ম প্রচার ও ধর্ম পরিবর্তনের বিষয়টি ঠেকাতে স্থানীয় আদিবাসীরা বিদ্রোহ স্বরূপ বুদ্ধের জন্ম দিনটিকেই শিকার উৎসব অর্থাৎ পশু হত্যার উৎসব হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত গ্ৰহণ করেন। ভূমিজ কুড়মী প্রভৃতি আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ প্রথমে এই উৎসব শুরু করেন। কারণ সেই সময়কালে নিজ ধর্ম বিষয়ে তাঁরাই ছিলেন সচেতন। পরবর্তীতে সাঁওতালরা এসে মিলিত হন। এবং কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলেন। তাই "সাঁওতাল কুড়মি ভায়াদ ভায়াদ"(একই বংশধর) বলে একটা কথার প্রচলন হয়। অনেক ক্ষেত্রে যা এখনও উচ্চারিত হয় অনেকের মুখেই। 
               অন্যদিকে সাঁওতালরা সেহেতু প্রথমদিকে শিকার এবং কাষ্ঠ খোদাই শিল্পের উপরই জীবন জীবিকা নির্বাহ করতেন ফলে শিকারে তাঁরা ছিলেন সুদক্ষ। এই কারণে শিকার উৎসবে ধীরে ধীরে তাঁদের গুরুত্ব বাড়ে এবং একটা সময় তাঁদেরই প্রাধান্য দেখা দেয়।
              সাঁওতালরা প্রথমদিকে এই আন্দোলনে যোগ না দেওয়ার মূল কারণ, সে সময় ধর্ম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তাঁদের অসচেতনতা। এবং এই অসচেতনতা এখনও অনেকাংশেই বিদ্যমান। এখনও তাঁদের মধ্যে ধর্ম পরিবর্তনের বিষয়টি লক্ষ্য করা যায়। তবে, এই সব যুক্তিরও কোনো লিখিত প্রমাণ নেই। সবই জনশ্রুতি। কিন্তু এটা ঠিক, শিকার উৎসব যে কারণেই শুরু হোক, এটা কিন্তু আর নিছক একটি উৎসব নয়। সাঁওতাল কুড়মি ভূমিজ প্রভৃতি আদিবাসীদের কাছে এটা একটা রীতি, এটা একটা সংস্কৃতি। যে সংস্কৃতিকে সরাসরি আঘাত করা সমীচীন নয়।
             বাম জমানায় শিকার বন্ধ করার জন্য শুরু হয় নানা রকম প্রচার অভিযান। পাহাড়ে নানা ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও করা হয় স্থানীয় মানুষকে সচেতন করে তোলার লক্ষ্যে। যার ফলও হয় সুদূর প্রসারী।  আদিবাসীদের এটি একটি সামাজিক প্রথা। তাই জোর করে শিকার বন্ধ করা যাবে না, এই বিষয়টি সেই সরকার আঁচ করতে পেরেছিল। বর্তমান সরকারেরও সেভাবেই এগিয়ে চলা উচিত। তাহলেই একদিন এই পশুহত্যার উৎসব কেবলমাত্র রীতি পালন হিসেবে থাকবে। অন্যান্য উৎসবের মতো একটা আনন্দোৎসব হয়ে দাঁড়াবে।


১৩/০৫/২০২২

( "বাংলার চোখ" খবরের কাগজে ১৫/০৫/২০২২ প্রকাশিত )




ছবি : আন্তর্জাল