অসমাপ্তিকা হয়েও সমাপ্তিকা, এ এক চরম পরিণতি

কল্পোত্তম


নবীন কবি দীপ্তিশিখা দাসের প্রথম কাব্যগ্রন্থ "আমি, অসমাপ্তিকা"। বইটির প্রকাশক তালতলের হাটের পক্ষে আলোক মুখোপাধ্যায়। প্রচ্ছদ পরিকল্পক আরেক কবি ও ঔপন্যাসিক দীপংকর রায়। সুন্দর বোর্ড বাঁধাই করা এই বইটিতে মোট বত্রিশটি কবিতা স্থান পেয়েছে, যার প্রতিটি ছত্রে ছত্রে নবীন এই কবির অন্তর্মনের উদ্ভাস পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। কবিকে করে তোলে কাচের মতো আলোকভেদ্য। যার এপাশ থেকে ওপাশে পেরিয়ে যাওয়া যায় অনায়াসে।
  এই কাব্যগ্ৰন্থের প্রথম কবিতাতেই কবি প্রকৃতির সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করে তুলতে পেরেছেন। তাই কবির মরমী মনের গল্প শুনতে জেগে থাকে রাত্রি। আর রাত্রির গল্পের পাহারায় থাকে কবির চোখের কাজল---
              "গহীন বনের জ্যোৎস্নায়
                       তোর গল্প শুনতে জেগে থাকে রাত্রি
                আর আমার ঘুমের প্রহরী তুই
                আমি চাই তোর গল্পের পাহারায় থাক
                                          আমার চোখের কাজল।"
           তারপর ছুটন্ত ট্রেনের প্রতিধ্বনি বুক কাঁপিয়ে যায় কবির। কারণ মনের গুপ্তকক্ষে সেই অভিশপ্ত বিদায় পর্ব, অভিমানের আঁচলে বিভাবরীর জাগরণ ও ঘুম জমায় আর কবিকে আরেক প্রতীক্ষার দিকে ঠেলে দেয় নীরবে। আর, তাই কি তার পুনরাগমনের প্রতিক্ষায় বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের রাধার মতো ব্যাকুল নয়নে পথ চেয়ে থাকেন কবি?
            পরবর্তিতে কবির "জীবন" শীর্ষক কবিতায় বর্তমান সমাজ জীবনের এক রূঢ় বাস্তবতার ছবি উঠে এসেছে। যে সমাজ জীবন কবি মনের শান্তি কেড়ে নিয়েছে, যে সমাজ জীবনে কবি হয়ে উঠেছেন ক্লান্ত; যে সমাজে কর্মের পরিণামে কবি শিউরে ওঠেন। এক পা এগিয়েও দু পা পিছিয়ে যান আতঙ্কে। কারণ এই সমাজে বাঁচতে গিয়ে ব্যর্থতার বেত্রাঘাতে ক্ষতর উপর ক্ষত বাড়িয়ে দিয়েছে তাঁর। তাই তিনি বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে উঠে নিভৃতে ভাবেন---
                          "জীবন রেখার এই বিষাক্ত পরিসমাপ্তি
                           না কি, বাকি এখনও"
             কবি বর্তমান সমাজের ট্রেন্ড হিসেবে চলে আসা মিথ্যে প্রেমের আলিঙ্গনে ধরা দিতে চাননি। তাই "দূর থেকেই ভালোবাসি" কবিতায় কবি স্পষ্ট ভাষায় বলে দিতে পেরেছেন---
                          "কৃত্রিম প্রেমের আচ্ছাদনে
                                     যদি ঢাকতে চাও
                            তাহলে বলি, আমি দূর থেকেই ভালোবাসি।"
             আবার এই কবিতাতেই কবি আরও জানিয়েছেন---জীবনে আপেক্ষিক মুক্তি তিনি চাননি। বরং ছোট্টো পৃথিবীর বন্দিশালায় নির্বাসনেই থাকতে চান শেষ সূর্য যতদিন কাছে থাকবে। অর্থাৎ তিনি যতদিন বেঁচে থাকবেন ইহলোকে। 
              একলা আকাশের বিষন্নতা ভাসিয়ে নিয়ে যায় কবির থমকে যাওয়া গানের লাইনকে। আর তখন সমস্ত অভিমান ঝেড়ে ফেলে কবিমন উষ্ণতা নিতে চায় জমে ওঠা বরফের কাছ থেকেও। কবির মনে আশার সঞ্চার ঘটে। সমস্ত দ্বিধা দ্বন্দ্ব ভুলে নতুন করে অনুপ্রাণিত হয়ে ওঠেন কবি। জীবন রসে জারিত করতে চান নিজেকে। ভগ্ন হৃদয়ের স্পন্দন গুলিকে নিয়ে আশার সুরে গান বাঁধতে চান আবার।
              "একান্তে" কবিতায় কোথায় যেন মৃত্যু চেতনার ইংগিত শোনা যায়। এই কবিতাকে আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ একটা প্রগাঢ় প্রেমের কবিতা, শরীরী আকাঙ্খার কবিতা বলে মনে হলেও তা কিন্তু নয়। এই কবিতায় কবি মনের আলাদা একটা উত্তরণের ছবি স্পষ্ট হয়ে ওঠে---
                             "একান্তে আসবি তুই,
                                                        ভিড়ের জঙ্গল পেরিয়ে;
                              সবার আড়ালে, অগোচরে।

                              চুপিচুপি হাত ধরে চলব ওই রাস্তায়, নিয়ে যাবি
                                                               নদীর পাড়ে;"
              তবে জীবন যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলা কবিমন মৃত্যুকে ভয় পায় না। সে হাসিমুখে তাকে বরণ করতে পারে। তাই প্রতিদিন নিজের কালো কাজল রেখা দিয়ে তার ছবি আঁকেন কবি। আর গোলাপী ঠোঁটের হাসির রেখা দিয়ে আড়াল করতে চায় জীবনের সমস্ত কালোকে, অন্ধকারময় দিক গুলোকে।
               "শূন্যতা" কবিতায় ভিড়ের মধ্যেও কবি নিঃসঙ্গ হয়ে ওঠেন। কবি তাঁর সমমনের মানুষের অভাব বোধ করেন। তাই তিনি বলে ওঠেন---
                              "ভিড়; তবু নির্জনতা"
                সমস্ত সীমারেখা পেরিয়ে পথ চলে যায়। কিন্তু কবি যেতে পারেন না। এগোতে পারেন না সেই পথে। যে পথে হয়তো বা মনের কোণে জমে থাকা স্বপ্নদের পূর্ণ হওয়া সম্ভব। কবি আটকে পড়েন স্মৃতির বালুচরে। আর তখনই সমস্ত স্বপ্নেরা নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। হারিয়ে যায় জীবন সমুদ্রের অপরিচিত গভীরতায়। তাই "অভিসারিণী" কবিতায় গিয়ে শরীর মন জুড়ে ছুটে চলা প্রলয় নাচন থামিয়ে একটু নিশ্চিন্তের, একটু শান্তির জীবনের প্রত্যাশা করেন।
            আর শেষ কবিতা, অর্থাৎ যে কবিতার নামে এই কাব্যগ্ৰন্থের নামকরণ করা হয়েছে "আমি, অসমাপ্তিকা", এই কবিতায় কবি নিজেকে মহামায়ার অন্য রূপ হিসেবে বর্ণনা করে নিজেকে "অসমাপ্তিকা" হিসেবে ঘোষণা করলেও সেই ঘোষণার মধ্যে কোথায় যেন একটা খামতি দেখা যায়। কবির কন্ঠস্বরের দৃঢ়তা সুদৃঢ় হয়ে ওঠেনি সামাজিক নানা জটিলতায়। তাই তিনি লাল নদীর জোয়ারে ভেসে এসেও কবির অব্যক্ত কাহিনী হয়ে থেকে গিয়েছেন।
              এভাবেই বিভিন্ন ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে এক একটি কবিতার বুনন কবির এই কাব্যগ্ৰন্থকে আলাদা একটা মাত্রা দান করেছে। যা একদিকে যেমন কবির অন্তর্মনকে স্বচ্ছ করে তুলেছে, অন্যদিকে তেমনি সমাজ জীবনের কৃত্রিমতাকে, তার নোংরামোগুলোকে দেখিয়ে দিয়েছে চোখে আঙুল দিয়ে। এখানেই কবির কবিতা লেখার স্বার্থকতা। কবির এই কাব্যগ্ৰন্থের উত্তরণ। এই কাব্যগ্ৰন্থ পড়ে পাঠকের মনে হবে, এ যেন কবির না, তাঁরই ভেতরের চাপা পড়া আর্তস্বর, এই সমাজ থেকে, এই আন্তর্জাল থেকে মুক্তির আকুতি।





(কবি দীপংকর রায়ের "এবং কথা" ম্যাগাজিনের উনিশতম সংখ্যাতে প্রকাশিত।)