শিল্পে গোপনীয়তা শিল্পেরই অঙ্গ
কল্পোত্তম
শিল্প কেবল আনন্দ বিনোদনের জায়গা নয়। শিল্প পুঁজিপতি বা ভোগীদের ভোগ্য বস্তুও নয়। শিল্প হলো কোনো ব্যক্তির মনকে, মনের অবস্থাকে, তার ইচ্ছাকে বা তার দ্বারা উপলব্ধিত বিষয়কে অন্যের কাছে তুলে ধরার একটা কৌশল।
এই যে প্রক্রিয়া, তা বিভিন্ন মাধ্যমে সংঘটিত হয়ে থাকে। কখনো সাহিত্য, কখনো ছবি, কখনো নাটক, কখনো সিনেমা বা আরো অনেক অনেক শিল্পের প্রকাশ মাধ্যমের মধ্য দিয়ে। তবে শিল্পের একটা বিশেষ গুণ হল তার আপাত রঙহীনতা। প্রকৃতপক্ষে শিল্পের কোনো রং নেই। কোনো দল নেই। কোনো জাত ধর্ম নেই বলে মনে হলেও তার অন্তরালে এমন একটা গূঢ়ার্থ লুকিয়ে থাকে যাকে পাঠক বা দর্শকের সামনে দেখানো বা তুলে ধরায় শিল্পীর আসল উদ্দেশ্য।
তাই, একটাই শিল্পকর্ম এক একজন ব্যক্তির কাছে এক এক অর্থে ধরা দেয়। অর্থাৎ যে ব্যক্তির মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা যে রূপ তার কাছে সেই রূপে ধরা দিয়ে থাকে। একটু বিস্তার করে বলতে গেলে বলতে হয়, যে ব্যক্তি সবসময় ঠাকুর-দেবতা নিয়ে পড়ে থাকেন বা চিন্তা-ভাবনা করেন, সেই ব্যক্তির কাছে কোনো একটা কবিতা যদি ঈশ্বর সম্বন্ধীয় অর্থ প্রদান করে তবে সেই কবিতায় একজন যৌন ভাবনা চিন্তা নিয়ে পড়ে থাকা মানুষের কাছে যৌনার্থ প্রদান করে। তেমনই একজন গৃহস্থের কাছে গার্হস্থ্যের অর্থ এবং রাজনীতিবিদের কাছে রাজনৈতিক অর্থ প্রদান করে। কিন্তু এই সমস্ত কিছুর ঊর্ধ্বে সে অন্তরালে এমন একটা গূঢ়ার্থ বহন করে যার কাছে পৌঁছানোয় প্রকৃত পাঠক, দর্শক বা শ্রোতার উদ্দেশ্য। এটাই শিল্পের উৎকর্ষতা। তার পরিপূর্ণতা। এই গুণ ছাড়া কোনো শিল্পকে শিল্প বলা যাবে কিনা সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে।
আমাদের আধুনিক সমাজ যতই মুক্তমনা বা সাবালক হয়ে ওঠার দাবি করুক না কেন, প্রকৃতপক্ষে এখনও প্রাচীন যুগীয় গোঁড়ামি এবং কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। তাই পূর্বের ন্যায় বর্তমান সময়েও শিল্প সৃষ্টির ক্ষেত্রে বেশ কিছু বাধা রয়েছে। একজন শিল্পী ইচ্ছা করলেই শিল্প কর্মের মধ্যে সরাসরি সব বিষয় তুলে ধরতে পারেন না। যে সকল বিষয়বস্তুকে শিল্পের মধ্যে তুলে ধরার ক্ষেত্রে সামাজিক, রাজনৈতিক বা অন্য কোনো জটিলতা সৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে বা কোনো ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে সেইসব বিষয়বস্তুকে বিভিন্ন রূপকের আড়ালে রেখে তা ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেন শিল্পী।
একজন কবি হয়তো যৌন কবিতা লিখতে চান। অথচ সামাজিক প্রতিষ্ঠা বা সুনামে কোন রকম আঁচ লাগাতে চান না। রাজনৈতিক বা সামাজিক সমস্যাতেও পড়তে চান না। তখন তিনি বিভিন্ন রূপকের মাধ্যমে সেই বিষয়টাকেই কবিতাতে তুলে ধরেন দ্বর্থক ভাষায়। যাতে পরবর্তী ক্ষেত্রে কোনো রকম জটিলতা দেখা দিলে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে আসাও যায় এবং মনের ইচ্ছাটাও পূরণ হয় বা উদ্দেশ্যটাও সাধিত হয়।
একইভাবে কোনো রাজনৈতিক বিষয় বস্তুর সপক্ষে বা বিপক্ষে গিয়ে কোন প্রতিবাদী কবিতা লিখতে গেলেও একই পন্থা অবলম্বন করে থাকেন কবি। একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়। "ফেরেনি" শিরোনামের একটা কবিতা হল----
"বাবা গিয়েছিলেন
তাদের সঙ্গে গিয়েছিলেন
জোর করেই নিয়ে গিয়েছিল তারা।
বাবা ফিরেছেন।
ফেরেনি বেশকিছু অঙ্গ
বাবার শরীরের।"
এটা কয়েক পংক্তির একটা ছোট্ট প্রতিবাদী কবিতা। কোন্ কবির লেখা তা মনে নেই। তবে পাক অধিকৃত কাশ্মীরের জনগণের উপর পাকিস্তানি সেনার নির্দয় অত্যাচার এবং সেখানকার জনগণের অসহায়তার বিষয়টিকে তুলে ধরতে চেয়েছেন কবি।
সেখানকার কোনো অত্যাচারিত পরিবারের সন্তানের মুখ দিয়ে বলিয়েছেন পংক্তিগুলো। তার বা তাদের বাবা গিয়েছিলেন। অত্যাচারী সেনাদের সঙ্গে গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি স্বেচ্ছায় যাননি। তাঁকে জোর করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
তার বাবা শেষ অব্দি ফিরে এসেছেন। কিন্তু তাঁর শরীরের কিছু অঙ্গ ফিরে আসেনি। অর্থাৎ তিনি জীবিত অবস্থায় ফিরে আসেননি। এসেছেন মৃত অবস্থায়। কারণ বর্বর পাক সেনা তাঁর বেশ কিছু অঙ্গকে পাচার করে দিয়েছে।
এখানে পাক সেনার কাছে পাক অধিকৃত কাশ্মীরের জনগণের গুরুত্বহীনতা, হৃদয়হীনতা এবং পাক সেনার পিশাচ মনোবৃত্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সুর শোনা গিয়েছে কবিতাটিতে।
দেখা গিয়েছে বিষয়টিকে ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে কবির গোপনীয়তাও।
চিত্র শিল্পীরাও তেমনই চিত্র সৃষ্টির সময় কোনো বিতর্কিত, রাজনৈতিক বা সামাজিক বিষয়কে প্রস্ফুটিত করে তোলার ক্ষেত্রে গোপনীয়তা অবলম্বন করে থাকেন। এক্ষেত্রে দক্ষিণ ভারতীয় চিত্রশিল্পী রাজা রবি বর্মার একটা শিল্পকর্মের উল্লেখ করলেই বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
তিনি উনবিংশ শতাব্দীর প্রখ্যাত চিত্রশিল্পীদের মধ্যে একজন অন্যতম চিত্রশিল্পী। তিনি পরাধীন ভারতের পটভূমিকায় পৌরাণিক বিষয়বস্তু নিয়ে চিত্র সৃষ্টি করলেন। রামায়ণের ঘটনা রাবণের হাতে সীতা হরণ ও মাঝপথে জটায়ূ বধের বিষয়টিকে তুলে ধরলেন তাঁর চিত্রে। এটা একটা নিছক সরল পৌরাণিক ঘটনা মাত্র মনে হলেও তা কিন্তু নয়। এই চিত্রের মাধ্যমে তিনি সমসাময়িক সময়ে ভারতবর্ষের মানুষকে একটা আলাদা সংবাদ দিতে চেয়েছেন।
তখন ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসন বলবৎ রয়েছে। ক্রুড় শাসক ইংরেজরা ভারতবর্ষকে লুণ্ঠন করছে। এখানকার সম্পদ লুন্ঠন করে নিয়ে যাচ্ছে নিজের দেশে। তাদের দ্বারা লুন্ঠিত হয়ে চলেছে নারী সম্মান। লুন্ঠিত হয়ে চলেছে সাধারণ মানুষের শ্রমশক্তি।
এই লুন্ঠন ও সম্মানহানির পথে যারা বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তাদের জীবনহানি ঘটছে বা শাস্তি জুটছে। কুচলে দেওয়া হচ্ছে প্রতিবাদের অংকুর।
ইংরেজ শাসকের এইসব আচরণ বা দুষ্কর্মের বিরুদ্ধেই তিনি এই ছবি আঁকলেন। এবং ভারতবর্ষের মানুষকে স্বাধীনতা আন্দোলনে সম্পূর্ণরূপে ঝাঁপিয়ে পড়ার ক্ষেত্রে উদ্বুদ্ধ করলেন। অথচ ইংরেজ শাসক তা টেরও পেল না। সৃষ্টিকারীর শিল্পে গোপনীয়তা সম্পূর্ণরূপে ফলপ্রসূ হয়ে উঠলো।
কালে কালে দুষ্কর্ম ও শোষণ শাসনের বিরুদ্ধে, সামাজিক কুসংস্কার ও অনীতি অনিয়মের বিরুদ্ধে এভাবেই প্রতিবাদ করে এসেছেন শিল্প স্রষ্টারা। বিপথগামী সমাজ, ভ্রষ্ট রাজনীতি, শোষিত শ্রেণী বা জাতি এবং ক্ষতিকর ধর্মীয় প্রথাকে সঠিক পথ দেখিয়েছেন। কখনো সাহিত্যের মাধ্যমে, কখনো চিত্রশিল্পে, কখনো সিনেমা বা অন্যান্য মাধ্যমে।
তাই শিল্পে গোপনীয়তা শিল্পের একটা অভিন্ন অঙ্গ বা সহাবস্থানকারি হয়ে রয়েছে সব সময়। যার প্রয়োজনীয়তা অফুরন্ত। যতদিন শিল্প থাকবে, শিল্পী থাকবেন ততদিন শিল্পে গোপনীয়তাও থাকবে।
-------------------
ছবি : জয়দেব চক্রবর্তী
আরও পড়ুন

0 মন্তব্যসমূহ