আঙুল ধরে ধরে হাঁটাতে বলে। সাইকেলে চাপিয়ে ঘোরাতে বলে। জল তৃষ্ণা পেলে টেনে নিয়ে যায় হাঁড়ির কাছে। সে এখন বলতে পারে না। ইংগিতে বোঝাতে পারে সব।

            আকাশে চাঁদ উঠলে, দেখিয়ে বলে, এইটা? আমি বলি, চাঁদ মামা, আয় আয় আয়। ছোটো কাকুর পায়রাদের দেখিয়ে বলে, এইটা? আমি বলি, ছোটো দাদুর পাখি, মারবে। উড়িয়ে দিলে ছোটো দাদু মারবে তোকে। লক্ষ্মী ময়রার দোকানে গিয়ে ভাভরার ঝুড়ির দিকে আঙুল বাড়িয়ে বলে, এইটা, এইটা, এইটা। সেও মজা করে বলে, কোনটা, কোনটা, কোনটা? তারপর ছোটো একটা কাগজের টুকরোতে একটা ভাভরা ধরিয়ে দিলে টুকরো টুকরো করে খেতে শুরু করে বর্তিকা।

             সে আমাকে লিখতে দেয় না। সে আমাকে আঁকতে দেয় না। দেয় কেবল ভুরি ভুরি আনন্দ, বাৎসল্য প্রেম।

             অনেক দিন আগে থেকেই ঘরের দরজাটা লাগছিল না। কেবল ঠেকিয়ে রাখতে হতো। জোরজার করেও লাগাতে পারতাম না। চৌকাঠে থাকা লোহার পাতিটায় আটকে গিয়ে আওয়াজ করতো চিঁ চঁ। গতকাল সকালে ছেনি হাতুড়ি দিয়ে সেটাকে ঠিক করতে গেলে বার বার পা ঢুকিয়ে দেয় সে। ধরে ফেলে হাতুড়িটা। ছাড়িয়ে নিয়ে দূরে বসিয়ে দিলেও হামাগুড়ি দিয়ে আবার আসে। আমাকে ধরে দাঁড়িয়ে আবার ধরে ফেলে হাতুড়িটা। 

             আমি যা করবো সেও তাই করতে চাইবে, এই তার প্রবণতা। 

             আমার ভালো লাগে। তার এই প্রবণতা আনন্দ দেয় আমাকে। দিয়ে যায় ছোটো বেলার স্মৃতি।

             একটা সময় ছিল ছোটো ছোটো যন্ত্রপাতি নিয়ে পড়ে থাকতাম আমি। বাবা, ছোটো দাদু যা বানাতো তাই বানাতে চেষ্টা করতাম। সেইসব বানানোর উপযুক্ত যন্ত্রপাতি তৈরি করে নিতাম নিজে নিজেই। তৈরি করে কৌটোতে ভরে রেখে দিতাম মাটির পাঁচিলের উপর। ফাঁকা সময় পেলেই সেগুলো নিয়ে লেগে যেতাম ঠুকঠাক করতে। সেইসব দিনগুলো এখনও জ্বল জ্বল করে চোখের সামনে। ছোটো ছোটো বাচ্চাদের যন্ত্রপাতি নিয়ে খেলতে দেখলেই তাজা হয়ে যায় আবার। 

             আমার মেয়েটাও সেভাবেই এগোচ্ছে। টিয়াপাখির মতো বলতে শিখছে, রাম রাম হরে হরে। কারো লুটে নেওয়ার বদলে এগিয়ে দিচ্ছে হাতে ধরে থাকা খাবার। 

            মুক্ত মনে বড় হোক, মুক্ত মনে চিন্তা করুক। কারো লুটে না নিয়ে দিতে শিখুক আগে। এর বেশি কি চায় একজন বাবার। আমি গরীব হলেও টাকার গরীব, মনের না। এই গরীবিয়ানার পরিবর্তন সম্ভব। কিন্তু মানুষ একবার মনের দিক থেকে গরীব হয়ে গেলে জীবনে আর কখনও পরিবর্তন হওয়া সম্ভব নয়। তাই আমি কখনও সত্যিকারের গরীব ভাবি না নিজেকে। ভাবি, ঈশ্বর প্রদত্ত এই শিক্ষা সত্যিকারের রাজা হওয়ার দিকে এগিয়ে দেবে আমাকে। আর আমার বর্তিকাও একদিন এভাবেই হয়ে উঠবে রাজকন্যা।




কল্পোত্তম/১৪/৪/২০২১