ভোর তিনটা, ঘুম ভেঙে উঠে দেখি বর্তিকা ঘুমোচ্ছে। ঘুমোচ্ছে তার মা পালঙ্কের একপাশে। কবিতা লিখতে শুরু করলাম আমি। প্রেমের কবিতা। বেশ কয়েক দিন থেকেই একটা দু'টা করে প্রেমের কবিতা লিখছি। এখানে সেখানে ছেড়েও দিচ্ছি তাদের। বয়েও যাচ্ছে। মতামতও পাচ্ছি। ভালোও লাগছে। কিন্তু কেমন যেন মুষড়ে উঠলো মনটা। মেয়ের গায়ে তোলপাড় করা জ্বর আর আমি কি না কবিতা লিখছি। সেও আবার প্রেমের কবিতা। কেমন বাবা আমি?

             সোমবার বিকেল থেকে জ্বর হয়েছে বর্তিকার। সারা গা আগুন। কষ্ট হচ্ছে মাথা তুলতে। রাত্তিরে শোয়ার সময় মাথায় বার বার হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়াই। তারপর শুয়ে পড়ি। সারাদিন ইট জড়াই করে মড় মড় করছিল শরীরটা। সাধ্য ছিল না জেগে থাকার। 

              এর মাঝেই জেগে থাকতে হয়। এর মাঝেই লিখতে হয়। ভালোবাসার মানুষদের দিতে হয় উপহার। বিশ্রামের সময়টাতেই মোড়ক বাঁধতে হয় উপহারের। শব্দ, ছন্দ অথবা রেখা দিয়ে।

               আমি কবিতা লিখতে লিখতে হাত বাড়াই বর্তিকার দিকে। ছুঁয়ে দেখি কপালটা। তখনও গনগনে। চাপা নিঃশ্বাসের ভেতর কেমন যেন একটা শোঁ শাঁ শব্দ। এই শব্দের মাঝেই কবিতা লিখলাম। ছেড়ে দিলাম হোয়াটসঅ্যাপে, ফেসবুকের রানার গ্ৰুপে। ঈপ্সিতা, বিউটি, মধূপর্ণা, মৌসুমী, সীমা বৌদি, নীলু বৌদি, ইন্দ্রানীদি, ডরোথীদি, দেবমাল্য, বাপি, আরও কতো কতো জনের কাছে ছড়িয়ে দিলাম। কিন্তু মেয়ের জ্বরটাকে আমার কাছে ছড়ানোরও সাধ্য হলো না আমার।

              এই অসহায়তা সকল পিতার থাকে কি না জানি না। তবে আমার মতো পিতার কাছে এও এক ভূষণ।

              সকালে ঘুম ভাঙে বর্তিকার। শরীরে শক্তি পায় না। চোখের কোনায় জল জমে। অসহায়তার জল। আমারও জল আসে চোখে। তার অসহায়তা আসলে তো আমারও। তার চোখের জল আসলে তো আমারও। তাই সুন্দর একটা প্রেমের কবিতা লিখেও কেমন যেন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে মনটা।

             আজ ওষুধ দিলাম। হোমিওপ্যাথি ওষুধ। কাঁটাডি মোড়ের গুশাঁই ডাক্তারের কাছে। সর্দি কাশি হলে ছোটো বেলা থেকে সেখান থেকেই ওষুধ নিই বর্তিকার। ওষুধ নিই তার মায়েরও। 

               গুশাঁই ডাক্তারকে চিমতাম না আমি। গত এক বছর থেকে বেশ কয়েক বার যাওয়া আসা করে চেনা হয়েছে। আগে কৌরাং-এ বাড়ি ছিল। এখন কাঁটাডির বাসিন্দা। কাঁটাডি স্কুলের কাছে রাস্তার অন্য পাশে জায়গা কিনে বাড়ি বানিয়েছে সুন্দর একটা। ছোটো বেলা থেকে দেখতে দেখতে বর্তিকার নাড়ি নক্ষত্র জেনে ফেলেছে অনেকটা। 

              বাচ্চারা অসুস্থ হলে আদর চায়। বুকের মাঝে বসে থাকতে চায় চুপটি মেরে। অথবা গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া। এইসব না পেলে ঘেন ঘেন করে কাঁদে। বিরক্ত হয়। বিরক্ত করে বাকিদেরও। অসুস্থ হলে বাবা মা ছাড়া কাউকেই দেখতে পারে না সেভাবে।

               কয়েকদিন আগেই হাসিমুখো একটা ছবি পোস্ট করেছিলাম ফেসবুকে। আনন্দের ছবি। সেই ছবির পাশে বিষাদ কি মানায়? বিষাদ দেখানোর নয়। বিষাদ গয়নার মতো গোপনের বিষয়। বিষাদ লুকিয়ে রাখতে হয়। বিষাদ ভরা মানুষের জীবনে বিষাদ ঢাললে আনন্দ আর থাকে কোথায়? তাই মেয়ের তপ্ত শ্বাসের মাঝেও লিখতে হয় প্রেমের কবিতা। প্রেম ছাড়া কি আর আছে আমার।



কল্পোত্তম/১৩/৪/২০২১