১১ চৈত্র বৃহস্পতিবার, দুপুর নাগাদ কাজ থেকে ফিরে শ্যালিকাকে হোয়াটসঅ্যাপ থেকে ভিডিও কল করলাম। একটু আগেই ফোন করেছিল সে। বলেছিল, ভিডিও কল করো, দিদির সঙ্গে কথা আছে। তাই লাগিয়ে দিলাম ফোনটা। আমার বউ, মেয়েকে নিয়ে ভিডিও কল করতে করতে বাইরের দিকে চলে গেল একবার। তারপর ফিরে এসে বিছানায় শুয়ে শুয়ে কথা বলতে থাকলে আমি বেরিয়ে গেলাম স্নান করতে। ফিরে এলাম আধঘন্টা পরে। সাবান আর তেলের শিশি রেখে গামছাটা বাইরের তারে মেলে দিলাম। বসলাম খাবার খেতে। উল্টোপাশে বসে পড়লো আমার বউ। ভাত খাওয়াবে বর্তিকাকে। এমন সময় উঠে দাঁড়ালো বর্তিকা। কারো সাহায্য ছাড়াই উঠে দাঁড়িয়ে হাসি মুখে তাকালো। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসলো। মুখটা চকচক করছিল আনন্দে। সাদা আকন্দের মতো ধবধবে কয়েকটা ছোটো ছোটো দাঁত। পাঁচ সাতবার উঠবোস করে জানিয়ে দিল শিখে নিয়েছে সে। দাঁড়াতে শিখে নিয়েছে সবার মতো। তাই এতো আনন্দ।
প্রথমে পাল্টি খেতে শিখল। তারপর হামাগুড়ি। তারপর দাঁড়িয়ে পড়া নিজের পায়ে। তিন তিনটে ধাপ পেরিয়ে গেল অনায়াসে। একেই তো খেলা বলে প্রকৃতির। এইসব খেলার মধ্যেই আটকে যাই আমরা। বাঁধা পড়ি মায়ার ডোরে। যে ডোর আলগা হয়, লম্বা হয়, কিন্তু ছিঁড়ে না। মনের অজান্তেই বেঁধে রাখে এক জনের সঙ্গে আরেক জনকে। তার সঙ্গে আরেক জনকে। তার সঙ্গে আরেক জনকে। এভাবেই জড়িয়ে থাকি আমরা মহাজাগতিক জালে।
গতবছর বসন্তে চারপাশ লাল হয়ে উঠেছিল পলাশে। সব গাছে একসঙ্গে ফুটেছিল ফুল। বর্তিকা তখন দু'মাসের। কোলে নিয়ে মাঠের দিকে গেলে তাকিয়ে দেখতো ফুলগুলো। আমিও ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাতাম।
এ বছর ফুল হয়নি সেভাবে। একসঙ্গে পাতা না ঝরায় ফুল ফোটেনি একসঙ্গে। একটা গাছে ফুল আসতে আসতে ঝরে পড়ছে অন্য গাছের। লালে লাল হয়ে ওঠার সুযোগ পাচ্ছে না বাগানগুলো।
"ছবি তুলে রাখো, ছোটো ছোটো মুভমেন্ট গুলোর ছবি তুলে রাখো, নিয়ে রাখো বিশ ত্রিশ সেকেন্ডের ছোটো ছোটো ভিডিও ক্লিপস। পরে এডিটিং করতে সুবিধা হবে।" বলেছিল আমার এক শিল্পী বন্ধু দীপাংশু। অবশ্য আমি তার আগেই অনেকগুলো ছোটো ছোটো ভিডিও ক্লিপস নিয়ে রেখেছি। স্টিল ছবিও প্রচুর। আমার ভালোলাগা জিনিসের বা ব্যক্তির অভিব্যক্তি এবং নড়াচড়াগুলো ধরে রাখতে আমার খুব ভালো লাগে। অনেকদিন পরে হঠাৎ কোনো বৃষ্টিমুখর বিকেলে কোনো এক চালায় বসে বা ধুধু রোদ্দুরের সময় পাতাবহুল কোনো গাছতলায় বসে এইসব ধরে রাখা অভিব্যক্তি এবং নড়াচড়াগুলো দেখতে খুব ভালো লাগে। মনটা ভরে ওঠে আনন্দে। বিশেষ করে গ্ৰীষ্মের নিদাঘ দুপুরে ঘন পাতাযুক্ত কুসুম গাছ অথবা মহুয়া গাছের নিচে বিরাজ করা ঠান্ডার মধ্যে এইসব দেখতে দেখতে ডুবে যায় অপার আনন্দে।
আজ দাঁড়াতে শিখেছে। দু'দিন পর পা তুলতে শিখবে। এক পা এক পা করে এগোবে। তখন আরও বেশি আনন্দ হবে তার। পুলকিত হয়ে জানান দেবে আমাকে। আমারও মনে ঢেউ খেলে যাবে আনন্দের। অর্থপূর্ণ মনে হবে পার্থিব জীবনটাকে।
কিছুদিন আগে পর্যন্ত আশায় আশায় ছিলাম কবে দাঁড়াবে। ছোটো ছোটো জিনিসপত্র, টুল, চেয়ার, খাট এগিয়ে দিতাম তার দিকে, অবলম্বন। এইসব অবলম্বন ধরে ধরে দাঁড়াতে শিখবে। শিখেও গেল। অবলম্বন ধরে দাঁড়াতে দাঁড়াতে দাঁড়িয়ে পড়লো অবলম্বন ছাড়াই। তাই তার আনন্দ। বাঁধ ভাঙা আনন্দে ভাসিয়ে দিল আমাকেও। বুঝিয়ে দিল হাঁটতে আর দেরি নেই তার।
কল্পোত্তম/ ৭/৪/২০২

0 মন্তব্যসমূহ