সে এতটাই অসুস্থ যে উঠতে পারছে না। মুমূর্ষু অবস্থায় শুয়ে শুয়ে কেবল দিন গুনছে শেষ যাত্রার। তবু, ছৌ নাচের প্রতি তার মায়া তাকে ছাড়তে দিচ্ছে না ইহলোক। ছৌ নাচের প্রতি অত্যধিক প্রগাঢ়তার জন্যই মহাকালকে হয়তো আরও কিছু আয়ু বাড়িয়ে দিতে হচ্ছে তার।
         দিনটা আঠারোই বৈশাখ। গ্রামে গাঁজন মেলা। সকাল থেকেই ঢাকের তালে তালে গুঞ্জিত হচ্ছে সারা গ্রাম। তার নিঃশ্বাসের বাতাসেও ঢাকের গুঞ্জন ঢুকে পড়ছে মাঝে মাঝে। সূর্যাস্ত হলেই শুরু হবে ছৌ নাচ। একের পর এক পালা। মেতে উঠবে গ্রামের মানুষের সাথে চার পাশের গ্রাম থেকে ছুটে আসা মানুষজন। প্রতি ঘরে ঘরে আসা আমন্ত্রিত বন্ধুবান্ধব আর আত্মীয়-স্বজন।
          তার প্রতি অন্যদিন যেরূপ নজর থাকে পরিবারের সকলের, আজ সেই নজরদারিতে খানিকটা ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। গ্রামের মন্দিরে জনসমাগম, পরিবারের বাচ্চাদের সাধ-আহ্লাদ মেটাতে দু'য়েকজন ব্যস্ত । বাকিরা ব্যস্ত পরিবারের অন্যান্য কাজে। পূজাপাটের জিনিসপত্র জোগাড়, সন্ধ্যাবাতি দেখানোর জন্য শালপাতার নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে খালা তৈরি করা, পরিবারের উপোসী মানুষদের খাবার দাবারের ব্যবস্থা করার কাজে ব্যস্ত ঘরের মহিলারা। তার দিকে নজর দেওয়ার ফুরসত নেই কারোর।
           তার বউ সকালবেলা খানিকটা তরল খাদ্য খাইয়ে দিয়ে ঘন্টাখানেক পরে স্নান করিয়ে দিয়েছে। প্রতিদিনের মতো বাসি বিছানা ঝেড়ে নতুন করে পেতে দিয়েছে। তারপর নিজেও কুমারী নদী থেকে স্নান করে এসে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে অন্যান্য কাজে।
            দুপুর নাগাদ তার বাপের বাড়ি থেকে ছোটো বোন ও বৌদি এসে পৌঁছায়। সঙ্গে আরো দু'জন দূর সম্পর্কিত ছেলে। তাদেরকে সে এর আগে দেখেনি।
           গাঁজন মেলার সময় প্রতিবারই নতুন নতুন আত্মীয়ের আবির্ভাব হয়ে থাকে। চেনা নেই জানা নেই এমন অনেকেই কে কোথা থেকে এসে পৌঁছায় বুঝে ওঠা কঠিন। তবে অপরিচিত হলেও আতিথিয়তায় কম পড়ে না কখনও। বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত থেকেও গ্রামের মানুষ এখনো ভাবে অতিথি দেব ভব। অতিথি নারায়ন। নারায়নের সেবায় যেন কোনো ত্রুটি না ঘটে।
          ছোটবেলা থেকে ছৌ নাচ ছাড়া আর কিছু বোঝে না সনাতন ভূঁইয়া। সেই কবে বাবার সঙ্গে ছৌ নাচ দেখতে গিয়ে তার মনের মধ্যে গেঁথে গিয়েছিল ছৌ নাচের সুর তাল। ছৌ নাচের সাথে গাওয়া ভাঙ্গা ভাঙ্গা ঝুমুরের কলিগুলো আগুন জ্বালিয়েছিল তার মনের মধ্যে। তখন থেকেই ছৌ নাচের প্রতি তার টান কেমন যেন বাড়তে থাকে। ছৌ নাচের নাম শুনলেই বাবার হাত ধরে বেরিয়ে পড়ে সে। নিয়ে যেতে না চায়লে কেঁদে কেটে অস্থির। আর বাড়ি ফিরেই শুরু হয়ে যায় সেইসব নাচের রিয়ার্সেল। কুমারী নদীর তীরে গরু চরাতে গিয়ে সবার অলক্ষ্যে পরপর চলতে থাকে একেকটা ছৌ-এর ঝাঁপ শেখার অপার চেষ্টা।
         এই চেষ্টা যে কতটা আন্তরিক ছিল, সনাতনের পায়ের অপরিনত ঝাঁপ ঠিক কত তাড়াতাড়ি পরিনত ঝাঁপে রুপান্তরিত হয়েছিল তা না জানলে বুঝে ওঠা কঠিন।
          সেই অপরিনত বয়সে মাত্র বছর খানেকের মধ্যেই গনেশ, কার্তিক, শিব, দূর্গা, দৈত্য সহ পরশুরামের ঝাঁপ এবং কিরাত-কিরাতিন নাচের নিখুঁত আদব কায়দা শিখে ফেলে সে। নাচের সাথে সাথে শিখে ফেলে বেশ কিছু ঝুমুরের কলি। গরু বাগাল সনাতন এরপর চেষ্টা চালাতে থাকে কোনো একটা ছৌ-এর দলে ঢুকে পড়তে। কিন্তু কে নেবে তাকে? এইটুকু বয়স। সামান্য ভুল করলে খেসারত দিতে হবে দলকে। নিজের সুনাম নষ্ট করতে কে তাকে দলে নেবে?
            অনেক খোশামুদির পর দলে নিলো হরেকৃষ্ণ লায়া। তবে বলে দেওয়া হলো----বানর নাচতে হবে।
             "ঠিক আছে ঠিক আছে দাদা হামি বাঁদরেই নাইচব।" আনন্দে আত্মহারা হয়ে তাতেই রাজি হয়ে যায় সনাতন। 
             হরেকৃষ্ণ বলে," শুধু বল্যেই হবেক নাই। আগে ইয়ারসেল কত্যে হবেক। সন্ধ্যার সময় প্রতিদিন আইসতে হবেক মন্দিরের আখড়ায়। ঠিকঠাক ইয়ারসেল দিতে পাল্যে তবেই নিয়ে যাওয়া হবেক নাইচতে"
            সনাতনের মনের ভিতর দিয়ে যেন বিদ্যুৎ খেলে যায়। উত্তেজনায় বার বার কেঁপে কেঁপে ওঠে তার শৈশব-শরীর। ঘেমে যায় পায়ের পাতা।
            এবার আসরে ঢুকে নাচতে পাবে সনাতন। হাজার হাজার দর্শকের মাঝে দেখাতে পাবে নিজের নাচের কৌশল। পাবে অনেক অনেক মানুষের হাততালি।
            ছৌ নাচে টাকাপয়সা হয় না। হয় আনন্দ ফুর্তি। ছৌ দলের সদস্য তনু, মথুর, আমাবতীদের কাছে এ কথায় জেনে এসেছে সে। এই ফুর্তি টুকুই তাদের প্রেরণা। এই ফুর্তি টুকুই তাদের জীবন। ছৌ নাচ নাচতে পারাটাই পরম সৌভাগ্য।
           সন্ধ্যার সময় ছৌ নাচতে যেতে বারণ করে বাড়ির লোক। তবুও লুকিয়ে-চুরিয়ে রিয়ার্সেল করতে যায় সনাতন। সে জানে, এই সুযোগ হাতছাড়া করলে পস্তাতে হবে তাকে। সুযোগ বারবার আসে না। হরেকৃষ্ণ লায়ার মতো সাদাসিধে মানুষ পাওয়াও যায় না সব সময়। দেশের অভ্যন্তরে তো বটেই, আমেরিকা, গ্ৰেট-ব্রিটেন, জাপান, জার্মান ঘুরে আসা ছৌ দলের মালিক হরেকৃষ্ণের মতো মানুষ যে তাকে সুযোগ দিয়েছে এটায় সৌভাগ্য।
             দিন গড়িয়ে যায়। দিনের পর দিন দক্ষ হয়ে ওঠে সনাতন। বানর নাচের মাধ্যমেই দেখাতে থাকে নিজস্বতা। কোনো দলের কেউ যা পারেনি কোনোদিন তাই করে দেখায় সে। নিজের চরিত্রকে বাস্তব করে তোলার প্রয়াসে আসরের ধারে পোঁতা বাঁশের খুঁটিতে বানরের ভঙ্গিতে এমন ভাবে ওঠানামা করে, আশ্চর্য হয়ে যায় দর্শক। বিশ্বাস করতে পারে না, অভিকর্ষ বলের টানকে উপেক্ষা করে কিভাবে মাথা নিচের দিকে রেখে শরীরকে হাওয়ায় ঝুলিয়ে হাত পায়ের সাহায্যে সাবলীল ভাবে নেমে আসা সম্ভব!
            তার এই একটা কৌশল ছৌ দলের সুনাম চারগুণ বাড়িয়ে দেয় চারদিকে। ওস্তাদ হরেকৃষ্ণ লায়ার বানর নাচ দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকে মানুষ। 
             এর কিছুদিন পরেই অন্যান্য ভূমিকাতেও নাচার সুযোগ হয় তার। দলের কোনো সদস্য কোনো কারণে অনুপস্থিত থাকলে তার ভূমিকায় আসরে প্রবেশ করে সে। ফুটিয়ে তোলে নিজের দক্ষতা। হাততালি আর কুলকুলিতে ভরিয়ে তোলে আসর।উড়িয়ে দেয় ধুলো। এইভাবে কিছুদিন যেতে যেতে প্রায় সকল নাচেই পোক্ত হয়ে ওঠে সে। আসরে ঢুকতে প্রথম প্রথম যে একটা ভয় ভয় থাকে সেই দুরু দুরু ভাবটা একেবারেই কেটে যায় তার। দলের সাথে সাথে আলাদাভাবে তারও সুনাম ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। তবে বানর নাচের গুরুত্বকে কখনই ছোটো করে না সে। সে জানে, এই বানরই সোনার লঙ্কায় পৌঁছাতে সাহায্য করেছে তাকে। আর সাহায্য করেছে সরল সাদাসিধে মানুষ হরেকৃষ্ণ লায়া। না হলে সনাতন ভূঁইয়া আজ ছৌ শিল্পী সনাতন ভূঁইয়া হয়ে উঠতো না।গ্ৰামের গরু বাগাল সনা হয়েই ঘুরে বেড়াতো নদী তীরের মাঠে ঘাটে।
           দেখতে দেখতে অনেক বছর কেটে যায়।কিশোর থেকে যৌবন, যৌবন থেকে বার্ধক্যে পা রাখে সনাতন। স্থায়ীভাবে পা রাখে নিজের চার দেওয়ালের মাঝে। এখন আর ঘরের বাইরে খুব একটা দেখা যায় না। ছৌ শিল্পী হিসেবে ছৌ নাচের আসরে আসরে সুদীর্ঘ জীবন কাটিয়ে স্থায়ীভাবে জায়গা নিয়েছে ঘরের কোনায়। এখন তার একমাত্র সঙ্গী নিজের বউ। তবে ছৌ নাচের সুর তাল কানে এলে, কোথাও ঢোল, ধামসা, সানাই বাজলে, কিম্বা দূর থেকে হলেও ঝুমুরের সুর ভেসে এলে তার মনের মধ্যে একটা অনুরণন তৈরি হয়। আপনাআপনি কেঁপে কেঁপে ওঠে তার বুকটা। আর মনে পড়তে থাকে তার কিশোর ও যৌবন কালের দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করে দেওয়া এক একটা ঝাঁপ----এক একটা গান, ঝুমুরের কলি----কই আইল্য গো নাই আইল্য মা-ই, নাই আইল্য গো তদের ছোটো জামাই।


কল্পোত্তম/১০/১০/২০২০
দুপুর ২ টা ৪৯ মিঃ