আমার দাদু যখন সাইকেল কিনেছিলেন সারা গাঁয়ের লোক দেখতে এসেছিল। বাঃ! বাঃ! বলে গর্ব করেছিল সকলেই। দাদুরও গর্ব হয়েছিল খুব। গাঁয়ের সকলের আগে সাইকেল কেনার গর্ব।
তিনিই একমাত্র মরদ, একমাত্র বাপের বেটা। সবার আগে সাইকেল কিনে দেখিয়ে দিলেন, কোনো অংশেই কম নন তিনি। বারবার ডাকাতি হওয়ার পরেও তাঁর যে কিছুই করতে পারেনি কেউ তা বুঝিয়ে দিলেন আরেক বার।
আমার তখন জন্ম হয়নি। সত্যি কথা বলতে গেলে, বিয়ে হয়নি বাবারও। বাবা তখন ছাত্র। কাঁটাডি স্কুলের চালাক শিয়াল। ছাত্র, শিক্ষক, শিক্ষিকা, সকলেই ঐ নামেই ডাকতেন। চালাক হওয়ার ফল স্বরূপ পেয়েছিলেন উপাধি।
বাবার মুখেই শুনেছি। এই সেই গল্পের ফাঁকে পুরোনো এই গল্পগুলো বেরিয়ে আসে মাঝে মাঝে।চালাক শিয়াল উপাধিতে কেউ কেউ এখনও ডাকেন। বাবার স্কুলের বন্ধুরা বাবার সামনে চলে এলে ঐ বলেই ডাকেন। সর্ব্বেশ্বর, জামিনী, হেমলতা প্রভৃতির মুখে নিজের কানেই শুনেছি।
সাইকেলটা কেনা হলো। কিন্তু চালাবেন কে? কেউ তো জানেন না। পলাশ জঙ্গলের পাশের মাঠে শুরু হলো অনুশীলন। সকাল, বিকেল, দুপুর যখনই সময় পান তখনই সাইকেল নিয়ে হাজির। একজন চড়ে বসেন উপরে, অন্যজন সাহায্য করার জন্য ধরে থাকেন ক্যারিয়ার। আর তাদের দেখার জন্য গাঁয়ের লোকের ভিড়। যখনই সাইকেল বেরোয় তখনই সমস্ত কাজবাজ ফেলে ছুটে আসে দেখতে।
গাঁয়ে সড়ক থাকলেও সেদিকে যান না। সেদিকে গাড়ি ঘোড়া। দু'একটা গাড়ি চললেও কখন আসে তার কোনো ঠিক নেই। একটুতেই বিপদ। মাঠেই সুরক্ষিত। গাড়ি নেই, ঘোড়া নেই, পড়লেও পাথর নেই। ধুলো ঝেড়ে উঠে গেলেই বেশ।
একটু একটু চালাতেই অনেকদিন লাগলো। তারপর শুরু হলো পাশ কাটানোর অনুশীলন। জঙ্গলের ভেতর গিয়ে চালানো। গাছেদের পাশ কাটিয়ে যেতে পারলেই বেশ! গাড়ি ঘোড়া, শহরের মানুষ সবাইকে পাশ কাটিয়ে যেতে পারবেন অনায়াসে। সমস্যাতে পড়বেন না কোথাও।
সমস্যাতে পড়তে হলো তখনই। গাছেদের ফাঁকে ফাঁকে চালাতে গিয়ে নাজেহাল হতে হলো তাঁকে। কিছুতেই ঘোরে না। সাইকেলের হ্যান্ডল সোজায় যেন যেতে চায় সব সময়। ঘুরলেও গাছের দিকেই ঘোরে। একবার, দু'বার, তিনবার, অসংখ্যবার গাছে গিয়ে ধাক্কা মারে সাইকেল। সামনের কভারটা বেঁকে যায়। আঘাত লাগে পায়েও। সকলেই বলে, "সাইকেল শিখতে গেলে রক্ত তো নেবেই। রক্ত না দিয়ে সাইকেল কি শেখা যায়?"
সাইকেল শেখা হলো রক্ত দিয়ে। শুরু হলো যাতায়াত। গ্ৰাম-গঞ্জ, রাস্তাঘাটের মানুষকে অবাক করে শুরু হলো হাট-বাজার, দোকানপাট, আত্মীয়দের বাড়ি যাওয়া।
যেখানেই যান সেখানেই একই ছবি। সাইকেল দেখা মানুষের ভিড়। ভ্যাবাচেকা হয়ে ওঠা সকলের। রাস্তায় যেতে যেতে সাইকেলের আওয়াজ পেয়ে তাকিয়ে থাকে মাঠের লোক, ক্ষেতের লোক। গাঁয়ের ভেতর যেতে যেতে তাকিয়ে থাকে গ্ৰাম সুদ্ধ মানুষ। আর আমার দাদু সাইকেল চালিয়ে চলে যান এক গ্ৰাম পেরিয়ে আরেক গ্ৰামের দিকে।
কল্পোত্তম / ১৭/৩/২১
0 মন্তব্যসমূহ