বলো।
আমি উত্তর দিতেই বলে ওঠে, মালুর বাবা টাকা দিতে এসেছিল, টিউশনির টাকা। ওদের কাছ থেকে কত নাও, মাসে?
কেন একশো টাকা। ওর মেয়ে তো থ্রিতে পড়ে, কত নেবে বলো! একশো টাকায় নিই। পড়তেই পারে না, তার আবার টাকা। নেহাতই কাজ ছেড়ে বসতে হয় ওদের পিছনে, তাই নিতে হয়। কিছু একটা না নিলে সম্মান থাকে না। শুধু শুধু পড়ালে কাজটাকে গুরুত্ব দেবে না।
আমি স্পষ্ট করে জানিয়ে দিলে বর্তিকার মা বলে, ঠিকই বলেছো। আজকালকার মানুষ সব কিছুর বিচার করে টাকা দিয়েই। তোমাকে, তোমার ভালোবাসাকে কেউ বুঝবে না। প্রাইভেট স্কুলগুলো এই ব্যপারটাকেই কাজে লাগাচ্ছে। পড়াক না পড়াক বেতনটা বাড়িয়ে দিয়ে দেখাচ্ছে, তাদের স্কুল অন্যদের থেকে ভালো। মানুষও ভাবছে, সত্যি তো, ভালো না পড়ালে কি বেশি বেশি টাকা নিতো। লোকেই বা বেশি টাকা দেবে কেন না পড়ালে? এই ভেবেই ভর্তি করে দেয়। যাঁচাই করে নেওয়ার মতো সময় কোথায়? মানসিকতাই বা ক'জনের আছে যাঁচাই করার?
শব্দটা কমে আসে। কান পেতেও শোনা যায় না। আঁচ দেওয়া বন্ধ করে বর্তিকার মা। ধানটা হয়ে এসেছে, নামাতে হবে।
একটু ঝাড়ু দিয়ে দাও খামারে। সোজা গিয়ে সেখানেই ঢালবো। ঢেলেই মেলে দেবো। একবার এখানে একবার সেখানে করার দরকার নেই।
আমি সাহার ঝাঁটার আঁটিটা নিয়ে সর সর করে ঝাড়ু লাগাই। পাঁচ মিনিটে পুরো জায়গাটাকে পরিস্কার করে দিই।
হয়ে গেছে, পুরো পরিস্কার করে দিয়েছি।এনে মেলে দাও।
বর্তিকার মা ধানগুলো এনে মেলে দিয়ে একটা লম্বা ডাং ধরিয়ে দেয় আমাকে। বলে, "বসে বসে মুরগিগুলো তাড়াও। কোথাও তো যাওয়ার নেই তোমার। নাকি কাজ আছে? কাজ থাকলে বলো। তাহলে আমি করে নেবো। মঞ্জুকে বসিয়ে খাবার খাবো সময় করে। ও সব সময় এখানেই থাকে। বর্তিকার সঙ্গে খেলে।" কথাগুলো বলতে বলতে আরো দু'হাঁড়ি ধান ছেঁকে উনুনে চাপায়। আমি ছোটো একটা খাট এনে খামারের একপাশে বিছিয়ে গল্পের বই পড়তে শুরু করি।
খানিক পরে কয়েকটা ছেলে আসে, হাতে একটা ফুটবল, কাকু কাকু, তোমাদের পাম্পটা দাও না।
কি করবি রে?
ফুটবলে দেবো। একদম চুপসে গেছে।
আমি হাত বাড়িয়ে দেখিয়ে দিই। ঐ তো, আঙিনায় রাখা আছে, নিয়ে নে।
ছেলেগুলো পাম্পটা নিয়ে ফুটবলে দেয়। আমি জিজ্ঞেস করি, আজ দুপুরেই ফুটবল নিয়ে বেরোলি যে? কাজ নেই তোদের? তারা একসঙ্গে বলে ওঠে, আজ ছুটি আছে কাকু।
কিসের? আমি জানতে চাইলে তারা জানায়, নেতাজীর জন্মদিন।
বাঃ! তাহলে তো আজ তোদের খুব মজা। সারাদিন খেলতে পাবি।
ছেলেগুলো হাসতে হাসতে চলে যায় মাঠের দিকে। গাঁয়ের পূর্ব প্রান্তের মাঠটা অনেকটা তেকোণা। মাঠের দু'দিকে পলাশ জঙ্গল, একদিকে ডোবা আর ছোটো একটা পুকুর। অগভীর এই পুকুরে জল থাকে আষাঢ় মাস থেকে আশ্বিন মাস। তখন মাছ, ব্যাঙ, জোঁক সবকিছুই থাকে। তারপর শুকিয়ে যায়। বন্ধ হয় মাঠে খেলতে আসা ছেলেদের হাত-পা ধোয়া। বন্ধ হয় ব্যাঙ জোঁক ব্যাঙাচিদের জলের উপর বিলি কাটা। পুকুরের মাঝে পলি মাটির স্তর খুব একটা নেই। নতুন পুকুর বলে সেইভাবে পলি জমার সুযোগ হয়নি। পলি জমতেও তো কয়েক বছর লাগে।
পলি নেই। পলিতে জন্ম নেওয়া প্রাণী বা উদ্ভিদেরও দেখা মেলে না এই পুকুরে। কেবল এক ধরনের ঘাস জন্মায়। জল যত বাড়ে ঘাসও তত বাড়ে। মোট কথা জলের উপর ভেসে থাকাটাই স্বাভাবিক জীবনযাপন তাদের।
এই ঘাস অন্যান্য ঘাসের মতো নরম বা মোলায়েম না। ঘাসের পাতার দু'পাশটা করাতের মতো। গায়ে আঁচড় লাগতেই চিরে দেয় চামড়া। ফিন ফিন করে বেরিয়ে আসে রক্ত কোথাও কোথাও। তারপর শুরু হয় জ্বালা। অনেকক্ষণ থেকে ঠান্ডা হয় ধীরে ধীরে।
পুকুরের উত্তরে নীলকমলের সেগুন বাগান। ঘন সেগুন বাগানের গাছগুলো লিকলিকে লম্বা, খুব একটা মোটা না। কাছে কাছে থাকায় মোটাবার জায়গা পায়নি। আলো বাতাস না ঢোকায় বেড়ে চলেছে ওপরের দিকে। সেদিকেই আলো, সেদিকেই বাতাস। নিচে শুকনো পাতার স্তুপ। পাখির বিষ্ঠা মেখে পড়ে আছে অসহায়। সেখানের রঙ কোথাও সাদা কোথাও ধূসর তো কোথাও মেটে মেটে হলদেটে। এই সেগুন বাগান আর পুকুরের পশ্চিম অংশ জুড়ে চলে গেছে বত্রিশ নম্বর জাতীয় সড়ক।
রাস্তাটা যখন সরু ছিল, একসঙ্গে দুটো গাড়ি ধরার জায়গা ছিল না, প্রতিটা গাড়িরই বাঁ পাশের চাকা নামাতে হতো মাটিতে। এই নিয়ে কত কেচ্ছা। এ বলবে, আমি নামাবো না। ও বলবে, আমি নামাবো না। লাঠি, সাবল, তলোয়ার বের করাকরির অবস্থা।
রাস্তায় একটা কুকুর মরলেও তার জায়গা হতো পুকুরটার পূর্ব প্রান্তে অথবা সেগুন বাগানের উত্তরে পুইতু মাহাতোর গোড়ায়। কয়েকদিন গন্ধ আসতো রাস্তার দিকে। গ্ৰামের উত্তর প্রান্তে অবস্থিত নদীর দিকে যাওয়ার সময় বিরক্ত হতো মানুষ। তারপর শুকিয়ে যেতো। কয়েকদিন কড়া গন্ধ খেয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতো তারা।
সেগুন বাগানের তলায় খুব একটা রোদ ঢোকে না। ঘন গাছ, বড়ো বড়ো পাতার ফাঁক দিয়ে যে টুকু আলো ঢোকে তাও হারিয়ে যায় কোনো না কোনো ডালে। ঝরে পড়া পাতাদের সৌভাগ্যে আলো এসে পৌঁছাতে পেরিয়ে যায় শীত। বর্তিকার মা ঝরা পাতার আগুনে ধান সেদ্ধ করতে শুরু করে আবার।
কল্পোত্তম / ২/৩/২০২১
0 মন্তব্যসমূহ