আন্তরিকতা
কল্পোত্তম
নীলকমলের সেগুনবাগান পড়ে থাকল। আমাদের বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে ৩২ নম্বর জাতীয় সড়কের ধারে শুকনো পাতার উপর পাখির বিষ্ঠা নিয়ে থেকে গেল নীলকমলের যত্নের সেগুন বাগান। অথচ সে নিজেই চলে গেল ফিরে না আসার দেশে। বেশ কয়েক মাস অসুস্থ থাকার পর হঠাৎ করে চলে গেল কয়েক দিন আগে।
তার বাবা ঝরি মাহাতোর আমল থেকে শূন্য পড়ে থাকতো জায়গাটা। কোনোদিন চাষ বাস করতো না। দখলে রাখার জন্য দু'তিন বছর পরপর একবার করে লাঙ্গল দিত কোনমতে। পুটুস, ভুতাং, আরো কত আগাছা ঘিরে ধরতো জায়গাটাকে। এখন সেটা সেগুন বাগান। উঁচু উঁচু গাছের ফাঁকে চোরা পথে ঢুকতে হয় আলোদের। কোনোদিন পারে। কোনো কোনো দিন ঢুকতেই পারে না ভেতরে। গাছের পাতায় ঠিকরে বেরিয়ে যায় বাইরে।
বাদল দিনের আকাশটা কালো হয়ে এলে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে সেগুন বাগান। বকের ডানায় আলো পড়ে ঠিকরে বেরোয় বাইরে। অন্ধকারে সাপের মাথায় মানিক জ্বলে ওঠার মতো জ্বলে ওঠে কালো আকাশটার একপাশে দিগন্ত রেখার ওপরে।
নীলকমলের সঙ্গে বড্ড বেশি ভাব ছিল আমার বাবার। দু'জন সাইকেল নিয়ে কত কত গ্ৰাম যে ঘুরেছে তার কোনো হিসেব নেই। কুড়মি সমাজের ডাকে বার বার যেতে হতো তাদের। জেলার বিভিন্ন গ্ৰামে যেতে হতো সামাজিক অনুষ্ঠানে। কখনো কখনো জেলা ছাড়িয়ে, রাজ্য ছাড়িয়ে ঝাড়খন্ডে।
গ্ৰামের অন্য কাউকে ডাকে না। চিঠি আসে না তাদের নামে। কোনোদিন না বেরোলে জানবে কি করে লোকে।
আমার দাদু যেতেন। তারপর বাবা। দাদুর অবর্তমানে চিঠি আসতো বাবার নামে। একা একা যেতে হতো বাবাকে। সেই থেকে নীলকমলের নামটা কমিটির খাতায় তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করে বাবা। যাতে করে দু'জন হয়। গল্প করে যাওয়া যায় রাস্তাটা। সেই নীলকমল অন্য রাস্তায় চলে গেল এবার। সামাজিক অনুষ্ঠান, সেগুন বাগান, ছেলে-বউ, নাতি- নাতনি, কুমারী নদীর তীরে সবজির ক্ষেত ছেড়ে চলে গেল অজানা দেশে।
সবজি ক্ষেতে তার ছেলেরা গেলে মনে হবে, "বাবা বসে আছে।" ঘরের ভিতর বিছিয়ে রাখা খাটের দিকে নজর গেলে নীলকমলের বউ বলে উঠবে, "হ্যাঁ গো খাবার খেয়েছো? এসো খেয়ে নাও।" আর আমার বাবার কাছে সামাজিক অনুষ্ঠানের চিঠি এলে তারও মনে হবে,"নীলকমল তো আছে, বিরক্তিকর মনে হবে না রাস্তাটা।" কিন্তু কারো ডাকেই সাড়া দেবে না নীলকমল। তার সাইকেলের চাকা দাগ কাটবে না আর রাস্তাতে। কেবল হাওয়া বইবে। তার সেগুন বাগানের পাতাগুলো কেঁপে কেঁপে উঠে বলবে, "নীলকমল, নীলকমল।"
কল্পোত্তম/১০/৫/২০২১
0 মন্তব্যসমূহ