"সাতরঙা পাড়" কাব্যগ্রন্থ : পাঠপ্রতিক্রিয়া

শ্রীদাম কুমার


"কুবোপাখি" প্রকাশনীর কাব্যগ্রন্থ "সাতরঙা পাড়"। কবি কল্পোত্তম। সুসম্পাদিত, ঝরঝরে মুদ্রণ, বোর্ড বাঁধাই, চিত্রশিল্পী পার্থপ্রতিম দাসের প্রচ্ছদ, সব মিলিয়ে---নান্দনিকতায় গ্রন্থটি পেয়েছে অনন্য মাত্রা।

ভেতরের পাতায় পাতায় রেখাচিত্রের অলংকরণগুলি --- কবির কবিত্বের সঙ্গে চিত্রাংকন দক্ষতারও পরিচয়বাহী।

যদিও কবিতাকে দশক দিয়ে চিহ্নিত করাটা সমীচীন নয় বলে অনেক গুণীজনই মনে করেন । তবুও বাংলা কবিতা আলোচনায় এর চলন দেখা যায় বা ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এই সময়ের, বলা ভালো বর্তমান দশকের কবিতার ধমনী-স্পন্দন বুঝতে, তার মর্জির খানিকটা আঁচ পেতে---একটি কাব্যগ্রন্থ বেছে নিলাম।
এই সময়ের বেশ কয়েকটি কাব্যগ্রন্থেই তা ফুটে উঠেছে। যেগুলি উল্লেখযোগ্য তো বটেই স্মরণযোগ্যতারও দাবি রাখে। যাই হোক পরিসর বিবেচনা করে, আপাতত কল্পোত্তমের "সাতরঙা পাড়" কাব্যগ্রন্থের পাঠ প্রতিক্রিয়া তুলে ধরা গেল ।

কাব্যগ্রন্থটিতে কখনো দর্শন কখনো বিজ্ঞান কখনো পুরান কখনো বা লোকশ্রুতি--- তাছাড়াও বহু বিচিত্র বিষয় উঠে এসেছে এবং একাকার হয়ে গেছে। কাব্যপ্রতিমার দেহে জড়ানো আঁচলে সাতরঙা পাড় সৃষ্টি করেই একেকটি অনন্য বিভায় ভাস্বর এর একুশটি কবিতা।

         "বিছানায় তুমি হঠাৎ নীল নদী 
                ছলাৎ ছলাৎ ঢেউ 
                পাড় ভাঙ্গে ।

                আকন্ঠ পান করে আমি একা
                রাতজাগা নাভি গন্ধ
                ধুয়ে গেছে বর্ষায় । "

                    *     *     *

এই লাইনগুলি দিয়েই কাব্যগ্রন্থটির শুরু--'প্রবাহী' নামের এই প্রথম কবিতাটিতে পাই  ঢেউয়ের প্রবাহ...। নর-নারীর পারস্পরিক চিরন্তন প্রবর্তনার আবর্তে সীমিত না থেকে কবিতার সুরটি পৌঁছে গেছে এক নতুন উত্তরণের তীরে। মিশে যায় সৃষ্টি ধারার এক অমোঘ ঐকতানে। এর অভিমুখটি চির উন্মুক্ত থাকে প্রবাহে --সজীবতায়, সরসতায় । আর তাই কবিতার  শেষাংশ এরকম

                "অর্ধেকপৃথিবীকে  গর্ভে নিয়ে
                 এগোতে পারো দিগন্তের দিকে ।"

বর্তমান সময়ের ও সমাজের প্রবল চাপের মুখে মানুষের দিশাহারা অসহায়  চিত্রটি তুলে ধরতে মহাভারতের  অনুষঙ্গগুলি কবিতায় উঠে এসেছে ---

                   "তোমার সুপ্ত বাসনা আজও
                    অলিতে গলিতে ঘরে ঘরে
                    অনাবৃত করছে নারীদের
   
                             *      *      *

                     অসংখ্য পান্ডুপুত্রেরা কেঁদে যাচ্ছে 
                     চরাচরময় । "

তবে সমাজ-রাষ্ট্রের প্রতি কবির  বিদ্রুপ- ইঙ্গিতটিও লুকানো নেই---
   
                      "ভয় করে 
                      একালের দেবতারাও 
                      ধর্ষণে জড়িত ।"

আবার মনসামঙ্গলের বেহুলার প্রসঙ্গ টেনেই এরকম পঙক্তিও কবিতায় জাগিয়ে তোলে প্রতিবাদের স্বর---

                      "কলার ভেলা থেকে নেমে পড়ো
                       খসে পড়ুক এক একটা হাড় 
                       স্রোতগর্ভে ।"

ভারতীয় জীবনদর্শনে শূন্যের দর্শনের এক প্রশ্নাতীত স্থান রয়েছে। রামাই পন্ডিতের 'শূন্যপুরাণ '-এ তারই গৌরবময় উপস্থিতি। বৌদ্ধদর্শনকে ঘিরেও আছে শূন্যতাবাদ। কবি‌‌ কল্পোত্তম দর্শনের শূন্যতাকেই শুধু নয় বিজ্ঞানের প্রজ্ঞাকেও মিশিয়ে দিতে পেরেছেন । আবার কবিতার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে নিয়ে পুরাণ-লব্ধ বাসুকি নাগের ধারণাটিকেও রসোজ্জ্বলতায় তুলে ধরেন---

                     "অসংখ্য জীব তারার
                      শূন্য হয়ে যাওয়ার ঘটনা
                      সংঘটিত হতে দেখে কেঁপে উঠেন ঈশ্বর
                      মাথা নাড়ে বাসুকিনাগ।"

ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বরের ধারণাটি কি আমরা দেখতে পাই না? যখন কবিতায় উচ্চারিত হয়---

                       "তুমি আগলে রাখো অন্ধকূপ 
                        অন্ধকূপ নিশ্চিত করে 
                        তোমার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের 
                        আসা যাওয়া ।

                         তবে কি চোরাস্রোত রয়ে গেছে
                         থকথক  অন্ধকারের ভিতরে ? "

'ছাপ' , 'নশ্বর', 'ষড়পদী' কবিতাগুলিতে মগ্নচৈতন্যের আলোছায়ার খেলা দেখা যায়।

আলোচনার পরিধি না বাড়িয়ে বাংলা কবিতায় কবির স্বাতন্ত্র্যটিকে চেনাতে  একটি কবিতার উল্লেখ না করলেই নয়। 'শান্তিবিন্দু' কবিতাটি দিয়েই এ বিষয়ে খানিকটা আলো ফেলা যেতে পারে---

                    "মুক্তার খোঁজে
                     যে ডুবুরি ডুব দিয়েছিল
                     অতল নোনাজলে 
                     তুমি তাকে উষ্ণতা দিয়েছো 

                     ডুবিয়ে আনন্দ পাও 
                     ডুবেও আনন্দ পায় সে।
                           *     *     *

                     নিপুন ডুবুরি আমি 
                     খুঁজে নিই তল 
                     অপার বিস্ময়মাখা শান্তি বিন্দু"

জীবনানন্দ দাশীয় ভাবধারার অনুবর্তনেই কবিতাটি শেষ নয়। কবি কল্পোত্তমের কবিতাটির, এর থেকে এক নতুন তাৎপর্যের বলয়ে উত্তরণ ঘটে গিয়েছে। বা বলা চলে অভিনবত্বের সংযোজন হয়েছে ,বৈচিত্র্য এসেছে। জীবনকে দেখার ও চেনার  বিশিষ্টতাটি এখানে স্পষ্ট। যা বাংলা কবিতায় কল্পোত্তমের নতুন অভিমুখটিও চিনিয়ে দেবে। 

প্রাসঙ্গিকভাবে বলতেই হয় পূর্বজদের প্রভাবের কুয়াশা ভেদ করে নব্বইয়ের দশকের কবিতায় মুক্তির আলোর ঝলক আসতে চলেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। হালভাঙ্গা নৌকার নাবিক এখানে ডুবুরি। বারংবার অভিজ্ঞতায় হয়ে উঠেছে দক্ষ ডুবুরি। তার উষ্ণতার মাঝেই জেনে যায় শান্তির নিশ্চিত সন্ধান।

পরিশেষে বলতে হয় নব্বই দশকের কবিতার অঙ্গনটি নানা দিক দিয়েই উজ্জ্বল ও নতুন সম্ভাবনা-প্রবনতার দিগন্ত উন্মোচনকারী । অনেকেই ভেবে থাকেন রবীন্দ্র পরবর্তী কবিতার জগত জীবনানন্দ দাশীয় বলয়েই  সীমায়িত হয়ে আছে। যেমন শ্রী মাহান্তি বলেছেন "যে যাই বলুক জীবনানন্দই আমাদের বাংলা কবিতার শেষ মানদন্ড।" এ এক মহা ভ্রান্তি। এর নিরসন হওয়া দরকার। হয় তাঁরা জীবনানন্দ পরবর্তী কবিতাকে অনুধাবন করতে পারছেন না কিংবা ওই গৎবাঁধা ধ্যান-ধারণার খোলস ভেঙ্গে বের হতে চান না।