পুরুলিয়াতে পরিযায়ী শ্রমিক বৃদ্ধির কারণ এবং তাদের সুবিধা ও অসুবিধা


কল্পোত্তম


করোনা পরিস্থিতি আমাদেরকে অনেক বিপর্যয়ের মুখে ফেললেও অনেক কিছুই দেখিয়ে দিল চোখে আঙ্গুল দিয়ে। অনেক কিছুই শিখিয়ে দিল। এই পরিস্থিতি তৈরি না হলে যা অনুধাবন করা সম্ভব হতো না আমাদের পক্ষে।
     ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে দীর্ঘ কয়েক দশক পর্যন্ত মানুষ অভাব অনটনের মধ্য দিয়ে দিন যাপন করে এসেছেন। মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন। সর্বস্বান্ত হয়েছেন। কিন্তু অন্য রাজ্যে তো দূরের কথা নিজের জেলার অন্য প্রান্তেও কাজ করতে যেতে চাইতেন না সাধারণ মানুষ। খেয়ে না খেয়ে আঁকড়ে পড়ে থাকতেন ভিটেমাটি। তার প্রধান তিনটি কারণ ছিল-----(১) অর্থের পিছনে মানুষের ইঁদুর দৌড়ের অভাব। (২) ঠিকেদারদের দুর্ব্যবহার এবং কাজ করিয়ে টাকা না দিয়ে সাইট ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া।(৩) বাইরে কাজ করতে যাওয়ার পর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে না আসা।
         তবে এই ছবিটা নব্বইয়ের দশক থেকে ধীরে ধীরে পাল্টাতে শুরু করে। আশির দশকে ভারতের বাজারে টেলিভিশন বিক্রি হতে শুরু করে এবং নব্বইয়ের দশকে তা গ্রামাঞ্চলেও এসে পৌঁছায়। তারপর নব্বইয়ের দশকে ভারতে মোবাইল পরিষেবা চালু হয় এবং শূন্য দশকের মধ্যে তা গ্রামাঞ্চলে এসে পৌঁছায়। পরিস্থিতি এমন হয় প্রায় প্রতি ঘরে পৌঁছে যায় মুঠোফোন। এইসব বিষয়গুলো গ্রামাঞ্চলের মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক চাহিদা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। যা নব্বইয়ের দশকে শুরু হয় এবং শূন্য দশকে চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। তারপর সেই চাহিদার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি ঘটে। 
          সোজা করে বলতে গেলে নব্বইয়ের দশক থেকেই পরিযায়ী শ্রমিকের গোড়া পত্তন ঘটে এবং শূন্য দশকের মধ্যে তা ছড়িয়ে পড়ে আগুন গতিতে। তারপর যত দিন গড়িয়েছে পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা ততই বৃদ্ধি পেয়েছে। কি শহরাঞ্চল কি গ্রামাঞ্চল, পিছিয়ে পড়া প্রায় সমস্ত জায়গা থেকেই মানুষ কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েছেন বাইরে।
           এই অবস্থাটা ভারতবর্ষের সমস্ত জায়গার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তবে, আমি কেবলমাত্র পুরুলিয়া জেলার পরিযায়ী শ্রমিকদের বিষয়টিকে নিয়েই আলোচনা করতে চাই এখানে।
        করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করলে ২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে লকডাউন শুরু হয় আমাদের দেশে। সম্পূর্ণ অপরিকল্পিতভাবে আচমকা লকডাউন করে দেওয়ায় সবথেকে সমস্যায় পড়েন পরিযায়ী শ্রমিকরা। হঠাৎ করে কাজ হারান তাঁরা। থাকা-খাওয়ার সমস্যায় পড়েন। একপ্রকার বাধ্য হয়ে কাজের জায়গা ত্যাগ করেন। অন্যদিকে লকডাউনের ফলে যাতায়াতের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরতে বাধ্য হন। কেবল যুবকরা নয়, বৃদ্ধা মহিলা থেকে শিশু, প্রায় সমস্ত বয়সের মানুষ বাড়ি ফেরার তাগিদে দলে দলে বেরিয়ে পড়েন রাস্তায়। বাদ যাননি গর্ভবতী মহিলারাও। অর্ধভুক্ত, অভুক্ত অবস্থায় বাড়ি ফিরতে গিয়ে নানা দুর্ঘটনায় পড়ে মৃত্যু হয় অনেকের। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলোর বিরুদ্ধে চারদিকে ছিঃ ছিঃ পড়ে যায়। ঠিক সেই মুহুর্তে একপ্রকার চাপে পড়ে পরিযায়ী শ্রমিকদের একটা হিসেবের মধ্যে আনতে বাধ্য হয় সরকার। সেই সময়কার হিসেব অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক দিক থেকে পিছিয়ে থাকা জেলা পুরুলিয়ার ঘরে ফেরা পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা ৬৭,০৩২ জন। তার মধ্যে ভিন্ রাজ্য থেকে আসা পরিযায়ী শ্রমিক রয়েছেন ৪১,৩৪৮ জন এবং রাজ্যের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা ২৫,৬৮৪ জন। এর মধ্যে অদক্ষ শ্রমিক রয়েছেন প্রায় বাইশ হাজার। কিন্তু প্রশাসনিকভাবে এই সংখ্যা দেখানো হলেও বাস্তব সংখ্যাটা যে অনেক বেশি তা অনায়াসেই বোঝা যায়।
         পুরুলিয়া জেলাতে সর্বমোট ২৪৫৯ টি গ্ৰাম রয়েছে বর্তমানে। এইসব গ্রামের প্রায় প্রতিটাতেই চেন্নাই, মুম্বাই, সুরাট, হায়দরাবাদ প্রভৃতি বড়ো বড়ো শহর এবং রাজস্থান, ঝাড়খণ্ড, ওড়িষ্যা সহ অন্যান্য রাজ্যে কাজ করা মানুষের সংখ্যা ৩০ থেকে ৩৫ জন। বড় বড় গ্রামগুলোর ক্ষেত্রে সংখ্যাটা আরও বেশি। এছাড়াও জেলার মধ্যে বা পাশের জেলাতে ইটভাটাতে কাজ করার জন্য প্রতিবছর প্রতি গ্ৰাম থেকে প্রায় আট দশটা পরিবার ছানাপোনা নিয়ে গিয়ে থাকেন। আর দোকানদানিতে কাজ করেন আরও কিছু শ্রমিক। অতএব গড় সংখ্যাটা দাঁড়াবে মোটামুটি ২৪৫৯ × ৪০ = ৯৮,৩৬০ জনের মতো।
        বাইরের রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া অধিকাংশ পরিযায়ী শ্রমিক নির্মাণকাজ এবং হোটেলের কাজে যুক্ত। কিছু শ্রমিক আবার এইসব কাজে যাওয়ার পর বেশি লাভজনক ভেবে আবর্জনার স্তুপ থেকে প্লাস্টিক এবং অন্যান্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য বস্তু নির্বাচন করে তা বিক্রি করার কাজে যুক্ত হয়ে পড়েন। কেউ কেউ আবার ছোটখাটো ব্যবসা করতে শুরু করেন।
         লকডাউনের পর এইসব শ্রমিকরা কাজ হারিয়ে ঘরে ফিরে এলে বেশ কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সরকার তাদেরকে বিভিন্ন কাজে লাগানোর জন্য সচেষ্ট হয়। তাদের সহজে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে ই-এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ অনলাইন পোর্টাল চালু করে পুরুলিয়া জেলা প্রশাসন। কর্মদাতা ও কর্মপ্রার্থী উভয়ের মেলবন্ধনের জন্য ‘বিশ্বকর্মা’ নামে এই বিশেষ পোর্টাল রাজ্যে প্রথম। পুরুলিয়া সার্কিট হাউসে রাজ্যের সেই সময়কার পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন মন্ত্রী শান্তিরাম মাহাতো ও পুরুলিয়া জেলা পরিষদের সভাধিপতি সুজয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে পোর্টালের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। www.vishwakarma.purulia.in – এই অ্যাড্রেসে রেজিস্ট্রার করে কর্মসংস্থানের নানা তথ্য পাওয়া যাবে। পরিযায়ী শ্রমিকদের নির্মাণ কাজ, কাঠের কাজ, মার্বেলের কাজ এবং অন্যান্য কাজে নানান শৈলী, নৈপুন্যতা এবং দক্ষতার বিষয়টিকে মাথায় রেখে এই পোর্টালের নাম দেওয়া হয়েছে ‘বিশ্বকর্মা’।
        কর্মসংস্থানের জন্য পুরুলিয়া জেলা প্রশাসনের এই অনলাইন পোর্টাল অনেকটা নকরি ডট কম বা লিংকডিনের মতই। একেবারে ব্লক স্তর পর্যন্ত পরিযায়ীদের সমস্ত তথ্য দেওয়া রয়েছে এখানে।সেইসঙ্গে পরিযায়ীদের নিয়ে ‘দ্য হোম কামিং, ডেস্টিনেশন পুরুলিয়া’ নামে একটি বইও প্রকাশিত হয়েছে একই সাথে। কিন্তু বাস্তব কথা হলো, ঢাক-ঢোল পিটিয়ে পোর্টাল চালু করা হলেও তাকে বাস্তবায়িত করার ক্ষেত্রে উল্টো চিত্র দেখা যায়। যে সকল পরিযায়ী শ্রমিকরা কাজ করার জন্য বাইরে গিয়ে থাকেন তাঁরা এই পোর্টালে গিয়ে কাজ খুঁজে নেওয়ার মতো দক্ষতা রাখেন না। এবং আধিকারিকরা সরজমিনে গিয়ে তাদেরকে কাজ দেওয়ার ব্যবস্থাও করেন না। যার ফলে বাস্তবে যাদের কাজ পাওয়ার কথা তারা কখনোই কাজ পায় না পোর্টাল থেকে।
        লকডাউনের পর ফিরে আসা পরিযায়ী শ্রমিকদের এককালীন অর্থ সাহায্যের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রমানপত্র হিসেবে চাওয়া হয় কর্মরত স্থানের প্রবেশ পত্র(gate pass / entry pass)। কিন্তু মূল বিষয় সেইসব প্রবেশ পত্র কাজ ছেড়ে আসার সময় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জমা নেওয়া হয়। ফলে নাম নথিভুক্ত করতে ব্যর্থ হন সেইসব পরিযায়ী শ্রমিকরা।
        প্রতি বছর পুরুলিয়া জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শ্রমিক হিসাবে অসংখ্য মানুষ ভিন্ রাজ্যে চলে যাচ্ছেন। সেইসব শ্রমিকদের সমস্ত দিক থেকে মনিটারিং করার জন্য জেলার সমস্ত ব্লকে শ্রম দফতরের অফিস আছে। কিন্তু ব্লক স্তরে তো দূরের কথা, জেলা প্রশাসনের কাছেও কাজের সন্ধানে বাইরে যাওয়া শ্রমিকদের কোনো পরিসংখ্যান ছিল না।
        ভিন্‌ রাজ্যে শ্রমিক হিসাবে কাজ করতে গেলে এজেন্সির মাধ্যমে শ্রম দফতরে নাম নথিভুক্ত করাতে হয়। সঠিক ঠিকানা, কাজের ধরন, মজুরির পরিমাণ ইত্যাদি তথ্যও প্রশাসনকে জানানোর নিয়ম। কিন্তু, সরকারি স্তরে প্রচারের অভাব ও সাধারণ মানুষের সচেতনতার অভাবে এই সব বিষয়ে এখনও অন্ধকারে অধিকাংশ শ্রমিক।
       এই কাজের জন্য প্রতি ব্লকে একজন করে আধিকারিক নিযুক্ত থাকার কথা। কিন্তু জেলার ২০টি ব্লকে মাত্র ১১ জন আধিকারিক নিযুক্ত রয়েছেন। কোনো কোনো আধিকারিকের ঘাড়ে দুই দপ্তরের দায়িত্ব এবং কোনো কোনো অফিসের দায়িত্ব করণিকের ঘাড়ে। এর থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায় সরকার পরিযায়ী শ্রমিকদের বিষয়ে কতটা সচেষ্ট।
       বেশ কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন অসংগঠিত শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি সহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা আদায়ের জন্য অস্ত্র হিসেবে বনধ ডাকলেও দাবি আদায়ে অনিশ্চয়তা এবং সংসার অচল হয়ে পড়ার ভয়ে তাদের  সঙ্গে তাল মেলায় না শ্রমিকরা। যার পূর্ণ সুযোগ গ্ৰহণ করে এইসব শ্রমিকদের কম বেতনে এবং কম সুযোগ সুবিধা দিয়ে খাটিয়ে আসা মালিকরা।
       পরিযায়ী শ্রমিকদের ভিন্ রাজ্যে বা ভিন্ জেলায় চলে যাওয়ার পিছনে বেশ কিছু কারণ এবং সুবিধা রয়েছে, সেগুলি হল নিম্নরূপ---
(১) পুরুলিয়া জেলাতে এখনও গ্ৰামাঞ্চলে ১০০-১৫০ টাকা এবং শহরাঞ্চলে ১৫০-২০০ টাকার বিনিময়ে সারাদিন পরিশ্রম করতে বাধ্য হচ্ছেন শ্রমিকরা। সেই তাঁরাই বাইরে গিয়ে একই কাজ বা অনুরূপ কাজের জন্য থাকা খাওয়া সহ ৩৫০-৪০০ টাকা পাচ্ছেন। আবার রঙের কাজের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকরা থাকা খাওয়া সহ ৫০০-৫৫০ টাকা পেয়ে থাকেন।
(২) স্থানীয় এলাকাতে প্রতিদিন কাজ পাওয়া দুষ্কর হয়ে ওঠে। ঠিকাদারদের মাধ্যমে কাছাকাছি শহরে (পুরুলিয়া, বলরামপুর, ঝালদা, রঘুনাথপুর,বাগমুন্ডি, মানবাজার প্রভৃতি) প্রতিদিন কাজ পাওয়া গেলেও মূল বেতন থেকে ১০-৫০ টাকা পর্যন্ত কেটে নেয় তারা। তারপর বাস ভাড়া এবং খাওয়া দাওয়ার খরচ। ফলে বেতনে পোষায় না। কিন্তু একবার বাইরে গিয়ে কাজে নিযুক্ত হলে কাজ পাওয়া যায় প্রতিদিন। কিছু কিছু কাজের ক্ষেত্রে দু'একদিন কামাই হলেও পাওয়া যায় বেতন। বাস ভাড়ারও বালাই থাকে না।
(৩) আগে ভিন্ রাজ্যে গিয়ে চার ছ' মাস কাজ করার পর নগদ টাকা নিয়ে আসার সময় অসুবিধার মধ্যে পড়তে হলেও বর্তমানে ব্যাংক একাউন্টের মাধ্যমে টাকা ট্রান্সফারের সুবিধা থাকায় নিজে বাড়ি না এসেও টাকা পাঠাতে পারছেন শ্রমিকরা।
(৪) পুরুলিয়া জেলাতে উঁচু-নিচু বন্ধুর ভূপ্রকৃতি এবং অনুর্বর মৃত্তিকাযুক্ত জমির পরিমাণ বেশি থাকার কারণে সেইভাবে চাষবাস হয় না। যৎকিঞ্চিৎ বা চাষ হয় সেই উৎপাদিত কৃষিপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি অন্যান্য দৈনন্দিন ব্যবহৃত দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধির তুলনায় যথেষ্ট কম। যার ফলে চাষ-বাসের পরিবর্তে ভিন্ রাজ্যে গিয়ে কাজ করায় বেশি সুবিধাজনক মনে হয় যুবকদের।
(৫) বিভিন্ন সরকার বিভিন্ন সময়ে পুরুলিয়া জেলাতে শিল্প-কারখানা গড়ে তোলার জন্য বেশকিছু শিলান্যাস করলেও সেগুলি বাস্তবায়িত হয়নি। এই জেলার শহরাঞ্চলে থাকা ছোটো ছোটো শিল্প কারখানাগুলিতে শ্রমিকদেরকে এমনভাবে বেতন দেওয়া হয়, কোনমতে খেয়ে পরে বাঁচা ছাড়া আর কিছু করা যায় না।
(৬) পুরুলিয়া জেলার কুড়মী সম্প্রদায়ের মানুষজন দীর্ঘদিন ধরে চাষ-বাসের সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন। কিন্তু এই সমাজে উত্তরোত্তর পণপ্রথা বৃদ্ধির কারণে কাঁচা টাকা রোজগারের জন্য ভিন্ রাজ্যে কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পড়তে বাধ্য হচ্ছেন তাঁরাও। যাতে বাড়ির মেয়েদের সুন্দরভাবে বিয়ে দিতে পারেন।
(৭) জেলায় সুযোগ্য যুবক-যুবতী থাকা সত্ত্বেও কেবলমাত্র টাকার লোভে এই জেলার বিভিন্ন সরকারি পদে নিয়োগ করা হচ্ছে বাইরের জেলার যুবক-যুবতীদের। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের এই গভীর ষড়যন্ত্রের কারনে ভিন্ রাজ্যে কাজের সন্ধানে ছুটে যেতে বাধ্য হচ্ছেন শিক্ষিত যুবকরাও।
(৮) ঘরে থেকে স্থানীয় এলাকাতে কাজ করে প্রতিদিন রোজগার হলেও তা খরচ হয়ে যায়। সঞ্চয় করা সম্ভব হয় না। কিন্তু বাইরে গিয়ে চার ছ' মাসের টাকা একসঙ্গে নিয়ে এসে কোনো একটা কাজ করা যায়।
(৯) অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘদিন পরেও দক্ষ শ্রমিকের মর্যাদা দিতে চায় না জেলার ছোটো ছোটো শিল্প কারখানাগুলি। যাতে ঐ শ্রমিককে পূর্ণ বেতন দিতে না হয়। বাইরের রাজ্যে বা ভিন্ জেলায় গিয়ে এই অসুবিধায় পড়তে হয় না শ্রমিকদের। কিছুদিন কাজ করার পর দক্ষ শ্রমিকের মর্যাদা পান। পান সম্পূর্ণ বেতন
        এই সমস্ত কারণগুলোর জন্য ভিন্ জেলা ও ভিন্ রাজ্যের দিকে ছুটে চলেছেন পুরুলিয়ার শ্রমিকরা। যাদের সংখ্যাটা বছরের পর বছর উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে ভিন্ রাজ্যে যাওয়ার বেশ কিছু অসুবিধাও রয়েছে। যেমন---
(১) যত সংখ্যক শ্রমিক বাইরের রাজ্যে কাজ করার জন্য যান তার বেশির ভাগটাই নির্মাণ কাজের সঙ্গে যুক্ত। যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা প্রবল।
        বরাবাজারের সন্দীপ মণ্ডল নামে এক যুবক ২০১৩ সালে পুজোর পরে সুরাটে রঙের কাজে গিয়েছিলেন। দু’সপ্তাহ কাটতে না কাটতেই গ্রামে খবর আসে, সুরাটে একটি বহুতল বাড়িতে কাজ করতে গিয়ে  পড়ে মারা গিয়েছেন তিনি। তাঁর দেহ গ্রামেই ফিরল না। শেষ পর্যন্ত সেখানেই দেহ সৎকার করা হয়। এই রকম দুর্ঘটনায় পড়ে মৃত্যু বা আহত হওয়ার ঘটনা প্রায় প্রতি গ্ৰামের ক্ষেত্রেই একটা দু'টা লক্ষ করা যায়। 
         ২০১১ সালে চেন্নাইয়ে নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করতে গিয়েছিলেন মানবাজার থানার মানপুর গ্রামের এক যুবক। তারপর আর তিনি কোনও খবর পাঠাননি বাড়িতে। তাঁর স্ত্রী থানায় অভিযোগ জানানোর পর পুলিশ খোঁজ করে জানতে পারে, সেই ব্যক্তি চেন্নাইয়ে এক মহিলাকে বিয়ে করে সংসার পেতেছেন। তাই তিনি বাড়ির সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ রাখেননি।
(২) কোনো অসৎ ব্যক্তির মাধ্যমে কাজে নিযুক্ত হওয়ার কারণে দিন শেষে টাকা না পেয়ে অসুবিধায় পড়া। ট্রেনের বাথরুমে বসে বাড়ি ফিরতে বাধ্য হওয়া।
(৩) ভিন্ রাজ্যের আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পেরে অসুস্থ হয়ে পড়া। যার ফলে টাকা খরচ করে বাইরে গিয়েও কাজ করতে না পারা।
(৪) বাইরের রাজ্যে কাজ করতে যাওয়ার পর বাড়ির লোকের নজরে না থাকায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নেশাগ্ৰস্থ হয়ে পড়ছেন শ্রমিকরা। যার ফলে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে সাংসারিক অশান্তি।
(৫) নব্বইয়ের দশকে টেলিভিশন কেনার জন্য অনেক কিশোরদের ভিন্ রাজ্যে কাজ করতে যেতে দেখা গিয়েছে। কিন্তু বর্তমানে ভালো কনফিগারেশনের স্ক্রিন টাচ মোবাইল কেনার জন্য বা ভালো বাইক কেনার জন্য স্কুলের পঠন পাঠন ছেড়ে দিয়ে বাইরের রাজ্যে কাজ করতে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। যার ফলে পুরুলিয়া জেলাতে একদিকে স্কুলছুট কিশোরের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে বাড়ছে শিশু শ্রমিক। 
(৬) যে সকল পরিবার ইটের ভাটায় ইট তৈরির কাজে বছরের অর্ধেক সময় ছেলেপুলে নিয়ে বাইরে চলে যান বা কৃষি শ্রমিক হিসাবে বর্ধমান, হুগলিতে চলে যান, তাদের ছেলেপুলেদেরও ঐ সময় স্কুলের সঙ্গে কোনো সংযোগ থাকে না। বরং যতটা সম্ভব তারাও বাবা-মা'র সাথে কাজে হাত লাগায়। ফল স্বরূপ বৃদ্ধি ঘটে শিশু শ্রমিকের। যা সমাজকে অবক্ষয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
       এতসব সত্ত্বেও বলব এই বিশাল সংখ্যক শ্রমিক ভিন্ রাজ্যে কাজ করতে যাওয়ার কারণে বাকি পড়ে থাকা শ্রমিকরা জেলার মধ্যে কাজ পাচ্ছেন। ফলে অর্থনৈতিক দিক থেকে খানিকটা হলেও সচ্ছল হয়ে উঠছে পরিবারগুলো। যার ফলস্বরূপ দীর্ঘদিন ধরে বহুকষ্টে খড়ের চালের নিচে দিন কাটিয়ে আসা মানুষগুলো পাকা ছাদ বা এজবেসটারের তলায় দিন কাটাতে সক্ষম হচ্ছেন। সক্ষম হচ্ছেন মেয়ের বিয়ে দেওয়া সহ অন্যান্য সামাজিক আচার অনুষ্ঠানগুলো ভালোভাবে পার করতে। সক্ষম হচ্ছেন দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা ঋণের বোঝা শোধ করে ঋণমুক্ত হতে।
        পুরুলিয়া থেকে বাইরে কাজ করতে যাওয়া নতুন কথা নয়। কৃষি শ্রমিকরা রাজ্যের মধ্যে থাকায় সমস্যা হলে ভিন্‌ জেলার আধিকারিক অথবা রাজ্যস্তরের আধিকারিকের হস্তক্ষেপে সমস্যা মেটানো যায়। কিন্তু যে সব শ্রমিকেরা ভিন্‌ রাজ্যে গিয়ে সমস্যায় পড়ছেন, তাঁদের পাশে অনেক ক্ষেত্রেই সেভাবে দাঁড়ানো যায় না। 
        পুরুলিয়া জেলা শ্রম আধিকারিক মনোজ সাহার কথায়, “শিবির করার মতো লোকবলও নেই যে, বিভিন্ন জায়গাতে শিবির করে মানুষকে সচেতন করবো। তবে এ ব্যাপারে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলি এগিয়ে এলে আমাদের দফতর অবশ্যই তাদের সহযোগিতা করবে।”
        সরকার এইসব শ্রমিকদের পরিযায়ী শ্রমিক হিসাবে চিহ্নিত করলেও এদের পরিযায়ী শ্রমিক বলা হবে কিনা সে বিষয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে। তাঁদের মত, তাহলে কি ভিন্ রাজ্যে চাকরি করতে যাওয়া ব্যক্তি এবং পড়তে যাওয়া ছাত্র-ছাত্রীদেরও পরিযায়ী বলা হবে?



কল্পোত্তম /১৬/৬/২০২১