মগ্নতা / কল্পোত্তম




ধ্যানমগ্ন হয়ে বসে থাকলে কত কি যে মণিমাণিক্য ঝরতে থাকে আঁচলে এসে তার কোন ঠিক থাকে না। তেসরা শ্রাবণ দু'হাজার একুশ এমনই ধ্যানমগ্ন অবস্থায় বসেছিলাম আমি। বাইরে ঝম ঝম বৃষ্টি। আমার মেয়ে বর্তিকা আগের দিন তার মায়ের সঙ্গে মামাবাড়ি গিয়েছে। তার বড়োমামা দীনবন্ধু এসেছিলেন নিয়ে যেতে। রেশন কার্ডের সঙ্গে আধার কার্ডের লিঙ্ক করাবেন বলে।
         কতদিন হয়ে গেল। সেই দু'হাজার ষোলো সালে বিয়ে হয়েছে আমাদের। চার বছর পর বর্তিকা এল। শান্ত বাড়িটাকে কেমন যেন অশান্ত করে তুলল চিৎকার চেঁচামেচিতে, হাসিতে কান্নাতে, এতদিন যা প্রয়োজন ছিল না সেই সব প্রয়োজনীয় ছোট ছোট রান্নাতে। কখনও মেয়ে কাঁদে, কখনও মা কাঁদে, আমি আর কি করি? আমি তো বাঁদর। করি শুধু আদর।
         সেইসব চিৎকার চেঁচামেচির মাঝেই আমাকে মগ্ন হয়ে যেতে হয় আমার নিজের কাজে। কখনও কবিতায়, কখনও গদ্যে, কখনও গানে, কখনও বা প্রবন্ধে। সেই মগ্নতার মাঝে মাঝেই এসে ধ্যান ভঙ্গ করে দিয়ে যায় আমার উর্বশী।
-------শুনছো শুনছো? নুনুকে দেখো। বাইরের দিকে চলে যাচ্ছে। রাস্তার দিকে চলে যাবে।
         নজর ঘুরিয়ে তাকাতেই ছুটে যেতে হয় মেয়ের দিকে।
          তেসরা শ্রাবণ সেরকমটা ছিল না। তারা না থাকায় একটা সুবিধা হয়েছিল। তারপর রং লাগিয়ে ছিল অঝোর বৃষ্টি। একটা মায়াময় পরিবেশ। অনায়াসে মগ্ন হয়ে যাওয়ার পরিবেশ। তাই ডুবে গেলাম অন্য এক জগতে। দেখতে দেখতে বেরিয়ে এলো দু'খানা বাউল গান।
                                (১)
               "ও তুই মাটি দিয়ে ঘর বানালি
                মাটি দিয়ে ঘর বানালি
                আমি ভাবলাম আমার ঘর।"
                                (২)
                "অন্তঃসার শূন্য জীবনে, অসার কর মন
                 মন অসার করিলে পাবে, অমূল্য রতন
                 পাবে, অমূল্য রতন।"
       তারপর সকাল বেলার শুভেচ্ছা বার্তা লিখতে গিয়ে বেরিয়ে এলো আরও সুন্দর চারটে লাইন।
                  "বৃষ্টি ঝরে ঝরুক রাতে
                   আমি ঝরি প্রাতে,
                   যে ফুল ফুটতে লাজায় দিনে
                    ফুটুক সে সন্ধ্যাতে।"
        আনন্দে ভরে উঠলো মনটা। নির্মলদা, স্বপনদা, দীপংকরদা, তপনদা, ডরোথীদি, সুনৃতাদি, ইন্দ্রানীদি ছাড়াও আরও পঞ্চাশ ষাট জনকে পাঠিয়ে দিলাম শুভেচ্ছা বার্তার চার লাইন।
        নির্মলদা প্রত্যুত্তরে সঙ্গে সঙ্গে জানালেন, বাহ্। আমি খুবই আপ্লুত হলাম। আসলে লাইনগুলোর প্রতি কেমন যেন একটা ভরসা ছিল আমার। ছিল একটা অতলান্ত আবেগ। যে আবেগ বলে বোঝানো কঠিন। যিনি উপলব্ধি করবেন তিনিও বোঝাতে পারবেন না অন্যকে। নির্মলদার ক্ষেত্রেও হয়তো তাই হয়েছে। তাই তিনি শুধুই বলে উঠলেন, বাহ্।
        অন্য কার ক্ষেত্রে কি হয় জানি না। অন্যরা কেমন ভাবে ভাবেন তাও জানি না। আমার ক্ষেত্রে আমার মতো করেই ছুটে ছুটে আসে মূল্যবান এক একটা লাইন স্রোতধারার মতো। আমি কেবল তাদেরকেই আটকে রাখি আমার খাতার পাতায় অথবা মোবাইলের নোটপ্যাডে। এই আটকে রাখাটায় আমার কাজ। 
        জেলেরা যেমন নদীর স্রোতে ছুটে আসা মাছকে জালের মধ্যে আটকে উপরে নিয়ে আসে, আমিও তেমন মনের স্রোতে ছুটে আসা লাইনগুলোকে আটকে  ভরিয়ে তুলি সাদা পাতা।
       কেউ কেউ কবি ভাবেন। কেউ কেউ ভাবেন ছবি। আমি ভাবি এও এক যাপন। জীবনের আয়ু রেখা অতিক্রম করে যাওয়ার একটা উপায় মাত্র। এই সুদীর্ঘ জীবন স্রোত পার করার কোনো তো একটা নাও দরকার।
       আমার বর্তিকা, আমার লেখা, আমার ছবি, আরও কিছু বিষয় আশয় আমাকে এপার থেকে ওপারে নিয়ে যাওয়ারই এক একটা সুসজ্জিত নাও। 


কল্পোত্তম /২০/৭/২১