ব্যাঙ্গাচি - ১
১.
অস্থি নেই, হাত-পা নেই তোমার
আছে চুপ করে থাকা
তাকিয়ে তাকিয়ে থাকা।
তোমার অস্তিত্ব যতটুকু
তারও অনেকগুণ কম করে দেখাতে দেখাতে
তোমাকে বিশ্বাস করাতে সক্ষম হয়েছে তারা
তোমার অস্তিত্ব, নেই বললেই চলে।
তাদের লাগাতার প্রয়াসে তুমি বুঝে গেছ
তুমি সামান্য। অতি সামান্য।
তোমার ওপরে ছড়ি ঘোরানোর মতো
যথেষ্টই ক্ষমতা আছে তাদের।
১৪/০৯/২০২৩
২.
তোমার ভেতর বাহির
সবই দেখতে পায় তারা
তোমার সবই জানা তাদের
তুমি স্বচ্ছ, সবকিছুই দেখা যায় তোমার, অনায়াসে।
আড়াল করার মতো চামড়া নেই
মোটা চামড়া
জটিল মনও নেই।
অবলীলায় দেখিয়ে দাও সবকিছু।
তোমার এই জটিলতাহীন জীবন
জিলিপির প্যাঁচ কষতে সহায়ক হয়েছে তাদের
অনায়াসে এগিয়ে দিয়েছে
তোমার দোরগোড়ায়।
তুমি স্বচ্ছ না হলে
সহজ ছিল না
তাদের এগিয়ে যাওয়া
কেন্দ্রের দিকে।
৩.
তোমরা অগুনতি
লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি
দলে দলে ঘোরো।
নগর মহানগর বন্দর
প্রতিটা পথসংযোগে তোমাদেরই ভিড়
তবুও ঐক্য নেই।
এক সুর এক তালে বাঁধা হয়েও
একেক জন
হারমোনিয়ামের একেকটা আলাদা রিড।
বাঁচার তাগিদ আছে সামান্যে
বাঁচার তাগিদ নেই সামান্য আঘাতে
তাই, বিচ্ছিন্ন করে তোলে অনায়াসে।
তোমাদের বিচ্ছিন্নতার প্রবণতা
সহজ করে
তাদের মতো করে নীতি প্রণয়নে। সহজ করে
এত এত ভিড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে তোমাদের।
৪.
ডোবাকে সাগর বললেও
ডোবাতেই বাস হবে তোমাদের
ডোবাতেই আনাগোনা, জীবন যাপন
ডোবাতেই কর্ম সম্পাদন ইহজীবন অথবা ইহলোকের।
ডোবাকে ডোবা বললেও
ক্ষতি নেই তোমাদের।
ডোবাকে সাগর বললে
লাভও নেই।
যা কিছু লাভ তার সবই তাদের।
ভূমন্ডলীয় বর্তমান অবস্থান
ঐতিহাসিক অথবা পৌরাণিক
সব কিছুই ধরা ছোঁয়ার বাইরে তোমাদের
সবকিছুই রহস্যে মোড়া
শহর, নগর, রাস্তা অথবা রাষ্ট্রের নাম পরিবর্তনে
কোথাও না কোথাও
নিজের অহংকেই জাগ্রত করে রাজা।
৫.
তোমাদের স্বচ্ছতাগুণে
তোমাদের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ
পরিলক্ষিত হয় সহজেই।
এই সহজলভ্যতা
বলিষ্ঠ করে তোলে মোটা, অস্বচ্ছ চামড়া ধারীদের।
তারা জানে, তোমাদের অসংখ্য জনের দৃষ্টিও
ভেদ করতে পারবে না
তাদের অস্বচ্ছ চামড়া,
দেখতে পাবে না
তাদের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ
অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্রিয়াকলাপ।
তোমাদের লক্ষ্যের বাইরে
তোমাদেরই পাঁকে ফেলার
সমস্ত ক্রিয়াকাণ্ড সম্পাদিত হয় তাদের হাতে।
১৫/০৯/২০২৩
৬.
হাত-পা নেই
সবারই একটা লেজ রয়েছে
একটা পিছুটান
এই পিছুটান নিয়েই বাঁচা, কোনমতে।
ডোবায় বেঁচে থাকার এতটা সময় কাটানোতে
একমাত্র সহায়ক এই লেজ।
কোথাও যাওয়া, কোথাও থেকে ফিরে আসা
অথবা কাছাকাছি ঘুরে বেড়ানোর এই অদ্বিতীয়
নিয়ন্ত্রক হলো লেজ।
চলন গমনের আর কোন পথ নেই, তাই
আর কোন মনোরথ নেই। জীবনে, জীবন কাটানোটাই
মূল লক্ষ্য ধরে বাড়িয়ে চলা বয়স
বাড়িয়ে চলা নির্ভরশীলতা
লেজের ওপর।
৭.
প্রতাড়িত, তাড়িত বা উৎপীড়িত হলেও
এক ডোবা থেকে অন্য ডোবাতে যাওয়ার
উপায় নেই তোমাদের।
ডোবা পরিবর্তনের জন্য মুখিয়ে থাকতে হবে
উপর ওয়ালার ওপরেই।
তার ইচ্ছাতেই এক ডোবা থেকে অন্য ডোবায়
যাতায়াত তোমার। তার ইচ্ছাতেই জলস্তর পরিবর্তন।
সৃষ্টি হওয়া প্রবাহ।
প্রবাহ ছাড়া কীভাবে যাতায়াত তোমার
অন্য ডোবায়?
স্বচ্ছ অস্বচ্ছ যে জলই থাক চারপাশে
মেনে নেওয়ায় একমাত্র পথ
তোমাদের বেঁচে থাকার।
অন্যথা জলহীন জীবন
বঞ্চনা, সেবাসমূহ থেকে।
৮.
অনেকদিন ভাসলাম, অনেকদিন হাসলাম
না বুঝেই। এখন অনেকে বলে, কুঁয়োর ব্যাঙ।
কুঁয়োর ব্যাঙ আমি?
সম্ভবত।
ডোবার তো নিশ্চয়ই।
যেখানেরই হই
অগাদ শান্তি নিয়ে থাকি বেশ।
শান্তি ভঙ্গকারী কে তুমি, পাশা খেলোয়াড়?
মন্ত্রী, সান্ত্রী অথবা তাদেরই পরামর্শ দাতা
কোন রাজার?
স্বচ্ছ চামড়াকে অস্বচ্ছ করে তোলার
কোন্ পরিকল্পনার কথা
এসেছ শোনাতে
অদ্ভুত নিভৃত সময়ে?
এই বেশ আছি
পাশাখেলাহীন জীবন
এই বেশ আছি
নির্ভয়ে করে উচ্চারণ,
কে তুমি রাজা মিথ্যার প্রলেপ যেমন?
৯.
মেরুদণ্ড নেই আমার
পারি না দাঁড়াতে কোথাও, সোজা হয়ে
অপরিপূর্ণ জীবন।
সোজা দাঁড়াতে গেলেই চাপ পড়ে
কোথাও না কোথাও টান পড়ে
সেই টান সামলাতে না পেরে
হয়ে যায় টলমল।
যাদের পরিপূর্ণ জীবন, সবদিক থেকে পূর্ণাঙ্গ
তাদের শিরদাঁড়া গেল কোথায়?
কীভাবে বেঁকে পড়ে তারাও?
অনেকগুলো দশক পেরিয়ে গেল
বাইরে থাকলাম প্রতিষ্ঠানের
কত রকম করে বোঝালাম কতজনকে
প্রতিষ্ঠানের ক্ষতিকারক দিক,
মৃত্যুর দশকে এসে বললাম, আসলে
ব্যক্তি নিজেই একটা প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে শেষমেশ।
প্রতিষ্ঠানকেই কী চেয়েছিলাম?
চেয়েছিলাম কোন না কোন স্মৃতিফলক? প্রতিষ্ঠা?
১০.
এক ডোবা থেকে আরেক ডোবাতে
কোনমতে গেলে
ফিরে আসা দায় হয়ে ওঠে পূর্ববৎ ডোবায়।
পূর্ববৎ ডোবায় ফিরে আসা, তখন স্বপ্ন।
এভাবেই স্বপ্ন ভেঙ্গে যায়
এভাবেই পথ বদলে যায়
এভাবেই রথ বদলে যায় আমাদের।
পূর্ববৎ পথ বা রথে ফিরে আসার ক্ষমতা
আমরা পাব কোথায়?
সে ক্ষমতা আমাদের নানা প্রজন্মে
ক্ষয়ে গেছে একটু একটু করে।
আমাদের মেরুদণ্ড ক্ষয়ে গেছে যুগান্তর কালের
নানা মুনির নানা প্যাঁচে।
মতভেদের অন্ত নেই আমাদের
নেই অন্ত পথের
পথে চলার এটাই অপ্রত্যাশিত বাধা।
এক ডোবা থেকে বেরোনোর সাহস
হারিয়ে ফেলি, ভাবি, কোন্ পথ নির্ভুল!
১৬/০৯/২০২৩
১১.
সংখ্যায় অসংখ্য হলেও
ডোবার জল কাদা করো না তোমরা
ডোবার জল কাদা করে রুই, কাতলা, বোয়াল।
ডোবার জল কাদা করে
তোমাদের স্বচ্ছ জলের অধিকার ছিনিয়ে নেয় তারা
ছিনিয়ে নেয় খাবার, বাসস্থান।
সুযোগ পেলেই ছিনিয়ে নেয়
বেঁচে থাকার অধিকারও।
কঠোর সংগ্ৰামের মধ্য দিয়ে
তারপরও বেঁচে থাকতে হয় তোমাদের,
তাকিয়ে থাকতে হয়
ঘোলা জলের স্বচ্ছ হয়ে ওঠার দিকে।
১৭/০৯/২০২৩
১২.
অনেক স্বজন হারানোর যন্ত্রণার পর
যেদিন পূর্ণাঙ্গ হয়ে উঠবো আমরা
লাফ দিয়ে বেরিয়ে যাবো ডোবা থেকে
সেদিন কেউ থাকবে না
বোয়ালের কাছে।
নিজের স্বভাব দোষে সেদিন
নিজেদেরই খাদ্য নিয়ে টানাটানি
নিজেদেরই জীবন নিয়ে খেলা
শুরু হবে নিজেদের মধ্যেই।
বোয়ালে বোয়াল কাটবে সেদিন
খাবে বোয়ালে বোয়াল।
১৮/০৯/২০২৩
১৩.
একেকবার
জলশ্যাওলার তলায় গিয়ে শুনি
তাদের চিরন্তন বিরহকথা,
বিগলিত জ্যোৎস্না-ভেজা রাতের কাহিনী।
কত পুণ্যস্নান শেষেও
ডোবার একপাশে
থেকে যাওয়ার ভবিতব্যে
তাদের এগিয়ে যাওয়া। এগিয়ে যাওয়া স্রোতের দিকে।
যেতে যেতে বাধা হয়ে দাঁড়ায় যারা
তাদের সরে যেতে বাধ্য করার মতো মনোবল
গড়ে ওঠেনি কখনোই। কখনোই বলতে পারিনি,
তাদের এগিয়ে যাওয়ার রাস্তা থেকে
সরে দাঁড়ানো দরকার তোমাদের।
১৪/১০/২০২৩
১৪.
ডোবায় থাকতে থাকতে সমুদ্রের স্বপ্ন দেখতে চায়লে
জানতে হবে
কীভাবে সাঁতার কাটতে হয় ঢেউয়ের বিরুদ্ধে,
কীভাবে বন্ধ রাখতে হয় মুখ কান।
এই কৌশল রপ্ত করার আগে পা দিও না কখনো।
সমুদ্রের বুক সব সময় লুকোতে চায়
আমাদের মূল্যবান স্মৃতি
মূল্যবান সময়
মূল্যবান গল্পদের।
সমুদ্র সব শিলালিপি মুছে
লিখে রাখতে চায় নিজেরই কথা।
ঢেউয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আগে
নিজের খোলনলচে পাল্টাতে হবে তোমাকে।
১৪/১০/২০২৩
১৫.
রিমঝিম বৃষ্টিপাতেই
তিড়িং বিড়িং করে না ব্যাঙ্গাচিরা
জমতে হয় জল
জমতে হয় পলি, ডোবাতে।
বহু বৃষ্টিপাতে
মাটির ভেতরে শেকড় মেলে জল
বেড়ে ওঠে জলতলও
বহু বৃষ্টিপাতে
পাওয়া যায় সুলুক সন্ধান
জল ডহরের
ব্যাঙ্গাচি ডহরের
খোঁজ করতে
কত আসা-যাওয়া
বক ও মাছরাঙার
সেই তল্লাশিতে এসেও
পাওয়া যায় মাছেদের!
২৯/১১/২০২৩

0 মন্তব্যসমূহ